মাত্র ৩৫০ টাকার জন্য একদিন কেঁদেছিলেন, আজ সেই প্রধান শিক্ষক পেলেন ডক্টর অব ফিলোসফি সহ ‘সুপারস্টার গোল্ড মেডেল’ সম্মান
কাঁথি, পূর্ব মেদিনীপুর: মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার জন্য বাবার কাছে মাত্র ৩৫০ টাকা চেয়ে একদিন চোখের জল ফেলতে হয়েছিল। আজ সেই মানুষটিই পেলেন ডক্টর অব ফিলোসফি সহ ‘সুপারস্টার গোল্ড মেডেল’ সম্মান। বহু গবেষক ও আইআইটি অধ্যাপক তৈরির নেপথ্য কারিগর তিনি। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথির নয়াপুট সুধীর কুমার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বসন্ত কুমার ঘোড়ই। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব ডিসাইপলশিপ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাপোস্টলিক মিনিস্ট্রিজের তরফে তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে তাঁকে।
বসন্ত কুমারের বাবা ছিলেন ধান চাষি। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবংয়ের সুন্দরপুর গ্রামে কেটেছে তাঁর ছোটবেলা। অভাবের সংসারে বড় হয়েছেন তিনি। স্নাতক পাশের পর মাস্টার্স করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৫০ টাকা। বাবার কাছে কান্নাকাটি করেও সেই টাকা জোগাড় হয়নি। শেষ ষ পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন বসন্তবাবু। নিজের চেষ্টায় জোগাড় করেন ৩৫০ টাকা। বাবাকে কিছু না জানিয়ে ভোররাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হন।
কর্মজীবনের শুরুতে তমলুক কলেজে ১০ মাস লিওন লেকচারার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৬ সালে দাসপুরের খুকুড়দহ হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ১১ বছর ৬ মাস শিক্ষকতা করেন। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে বদলি হয়ে আসেন কাঁথির নয়াপুট সুধীর কুমার হাইস্কুলে। সেখানেই শুরু হয় তাঁর বড় লড়াই। বিদ্যালয়ের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের উন্নতিতে জোর দেন তিনি। তখন মাধ্যমিকে ২৬০ জন পড়ুয়া পরীক্ষা দিলেও উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হতো মাত্র ১১ জন। ছাত্রসংখ্যা বাড়াতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতে শুরু করেন প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয়ে চালু করেন বিজ্ঞান বিভাগ।
মাধ্যমিকে প্রথম হওয়া যাদব মাঝির বাড়িতেও নিজে গিয়ে তাঁর বাবা-মাকে বোঝান। নিজের বিদ্যালয়ে ভর্তি করান তাঁকে। আর্থিক সমস্যার কারণে যাদবকে নিজের বাড়িতে রেখে পড়াশোনা করান। নিজের বাইকে করে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যেতেন। আজ সেই যাদব মাঝি আইআইটির অধ্যাপক। শুধু যাদব নন, আরও একাধিক মেধাবী ছাত্র তাঁর বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেছে। নিজের বাড়িকেই কার্যত হস্টেলে পরিণত করেছিলেন তিনি। একটি মাত্র ছাত্রীর থাকার জন্য বিদ্যালয়ে গড়ে তুলেছিলেন গার্লস হস্টেল। আজ সেই ছাত্রী দিল্লিতে গবেষণা করছেন।
পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই বসন্তবাবুর লক্ষ্য। তাঁর উদ্যোগে বিদ্যালয়ে তৈরি হয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম। স্কুল ক্যাম্পাসও পেয়েছে আধুনিক রূপ। আজও বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ুয়াদের স্কুলে ফেরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর এই শিক্ষা ও মানবসম্পদ উনয়়নে অসামান্য অবদানের জন্য ডক্টর অব ফিলোসফি সহ ‘সুপারস্টার গোল্ড মেডেল’ সম্মানে , ভূষিত তিনি।
এই সম্মান প্রসঙ্গে বসন্ত কুমার ঘোড়ই বলেন, “এই সম্মান আমার সামাজিক দায়বদ্ধতার নতুন এক স্মারক। এই অর্জন আমার সেই মায়ের জন্য, যিনি কোনওদিন স্কুলের মুখ দেখেননি। আর সেই সব প্রান্তিক পড়ুয়াদের জন্য, যাদের আমি মনে-প্রাণে ভালোবাসি। এই সম্মান আমার ৩০ বছরের শিক্ষকতার সহযোদ্ধাদের উৎসর্গ করলাম।”