অলকেশ মাইতি, ১৫ জুলাই, muthokotha.in: প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘন না করে বসন্ত আসে। মধ্য ভারতের জঙ্গলে তখন হালকা হলদে আলোর মতো ফুল ফোটে মহুয়া গাছে। ভোর হওয়ার আগেই আদিবাসী মায়েরা ঝুড়ি কাঁধে বেরিয়ে পড়েন। হাতির আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে, টুপটাপ ঝরে পড়া ফুল কুড়াতে কুড়াতে তাঁদের গল্পে মিশে থাকে পুরুষের ফেরার অপেক্ষা, উৎসবের গান, আর জীবনের টান। এই নিয়ে কত কথা, কত কবিতা আর কত গান ছড়িয়ে আছে লাজুক আকাশে।
তবে এই ফুল কোনো সাধারণ ফুল নয়,এটা ‘লাইফ অফ ট্রি’। আদিবাসীদের কাছে বেঁচে থাকার নাম মহুয়া। জীবনের ছন্দে মিলেমিশে একাকার হয়ে বেঁচে থাকার জন্য এক ছায়াসুনিবিড় শান্তির ঠিকানা।
ব্রিটিশ ভারতে একটা সময় ছিল যখন ব্রিটিশরা একে “বিপজ্জনক মাদক” বলে জঙ্গলে নিষেধের দাগ টেনে দিয়েছিল। মহুয়ার নেশায় সেই সময় মাদলের তাল যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, তারপর দেশ স্বাধীন হলো । স্বাধীন ভারতের মুক্ত মাটিতেও মহুয়াকে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে। আমরা একে “দেশি মদ” তকমা দিয়ে অবহেলা অবজ্ঞার চোখে কোণঠাসা করে রেখেছিলাম ।
কিন্তু মহুয়া যে থেমে থাকার নয়। মাটির ভাঁড়ে, আগুনের আঁচে সে নিজেকে আগের মতোই বুনো করে রেখেছে। ভাবটা এমন যেন–” আমাকে আমার মতো থাকতে দাও / আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি / যেটা ছিলোনা ছিলোনা সেটা না পাওয়াই থাক / সব পেলে নষ্ট জীবন !”
এই মিষ্টি প্রত্যয়ের মাঝেও পাকা কাঁঠালের মিষ্টি, কস্তুরীর গন্ধ, গোলমরিচের ঝাঁঝ নিয়ে সে আগের মতো আজও সমানভাবে ফিসফিস করে । আর তার সেই ফিসফিস আলাপ শুনে কবি কাজী নজরুল ইসলাম গাইলেন— “মহুয়া মদ খেয়ে যেন বুনো মেয়ে… সখি বাঁশি বাজে দূরে পাহাড়ে, যত নেশা বাড়ে তত মনে পড়ে লো”।
আজ আবার তামার পাত্রে দু’বার ফুটে সে নতুন রূপ পেয়েছে। কাঁচের মতো স্বচ্ছ, ফুলের মতো নরম। ৪০% নেশায় সে এখন ‘গ্রাপ্পা‘ আর ‘রাম‘-এর পাশে বসে ককটেলের গ্লাসে বরফ হয়ে গলে যায়। আধুনিক বাবুদের গ্লাস ভর্তি রঙিন পরশে কখন যে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে তা কেউ বুঝতেও পারেনি।
এ যেন প্রেমের মতোই দুই রূপ। এক রূপ উদ্দাম, আর এক রূপ রোমান্টিক। তবে ‘রোমান্টিক মহুয়া’ ভীষণ সনাতনী। গ্রামের উঠোনের মতো। ঝরা পাতায় স্নিগ্ধ হয়ে হালকা রঙের শাড়ি পরে সাতরঙা হয়ে ওঠে সে। আবার এর মধ্যেই ভীষণ কড়া, খোলা, বুকের ভেতরটাকে কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও সে রাখে। একবার খেলেই মনে পড়ে মাটির গন্ধ, শাল পিয়ালের পাতার হাতছানি , আর দুকূল ছুঁয়ে ছুটে যাওয়া ডুলুং নদীর কথা।
উদ্দাম রূপের মহুয়া আধুনিক। ‘ আধুনিক মহুয়া ‘ শহরের রাতের মতো মসৃণ অথচ অপার রহস্যময়। ‘মোজিতো’তে পুদিনা হয়ে, ‘ডাইকিরি’তে লেবু হয়ে সে এখন ফাইভ-স্টার হোটেলের ছাদে ব্যাণ্ডের তালে তালে নৃত্য পটিয়সী যুবতী । পায়ে তার নূপুর না থাকলেও সে গভীর ভাবে আসক্ত হয়ে নেচে ওঠে ‘ তা থৈ, তা থৈ !’ ডুবে থাকে তার প্রেমে পড়া আলাপচারীদের কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ফাঁকে।
এই যে এতক্ষণ ধরে আপনারা দুই মহুয়ার গল্প পড়লেন, সেই গল্পের আসল নায়িকা কিন্তু নারীরা। জঙ্গলমহলের সাদাসিদে জীবনযাপনে অভ্যস্ত, সহজ সরল ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মহিলারা। ফুল কুড়ানো থেকে বোতলবন্দি – সবটাই তাঁদের হাতে। ‘মণ্ড’ এবং ‘মহুলো” ব্র্যান্ডের পেছনে আছে ভিল আদিবাসী নারীদের সমবায়। এই ‘মণ্ড’ ও ‘ মহুলো’ হলো ভারতবর্ষের মধ্যপ্রদেশ আলীরাজপুর ও ডিন্ডোরি জেলার উপজাতি সম্প্রদায় দ্বারা তৈরি ঐতিহ্যবাহী মহুয়া ফুলের স্পিরিট বা মদের ব্র্যান্ড।
২০১১ সালে ভারতের অন্যতম বিজনেস ম্যান ডেসমন্ড নাজেরাথ প্রতিষ্ঠিত ‘ডেসমণ্ডজি ‘ আর একই পরিবারের ছয় ভাই দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘ সিক্স ব্রাদার্স ‘ আজ UK-অস্ট্রেলিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর ‘MAH’ (মহুয়া স্পিরিট) ভারতের জঙ্গল থেকে ফ্রান্সে উড়ে গিয়ে স্বচ্ছন্দে ইউরোপের বারে জায়গা করে নিয়েছে।
২০২১ সালে মধ্যপ্রদেশ যখন একে ‘হেরিটেজ লিকার’ এর তকমা দিল, সেই দিনই জঙ্গলের ফুল প্রথমবার মুকুট পরল। মহুয়া শুধু মদ নয়। এটা একটা খোলা চিঠি। জঙ্গল থেকে শহরে আসা চিঠি। গাছেরা পাতায় পাতায় একটা নারীর পরিশ্রমের ঘাম, একটা গাছের ছায়া, আর শত শত বছরের অপেক্ষার ফলের কথা লিখে ‘ মহুয়া’র হাতে পাঠিয়ে দেয় শহরে।
কবি বন্ধু মনোতোষকে বললাম —” বরফের টুকরো গ্লাসে পড়ার “টুং” শব্দের সাথে যখন মহুয়ার প্রথম চুমুক দেবে তুমি, মনে হবে কেউ কানে কানে বলছে – “আমি জঙ্গল থেকে এসেছি, শুধু তোমার জন্য। একবার দুজনেই তো কবিতা পড়তে গেছিলাম পশ্চিম মেদিনীপুরের ভসরাঘাটের জঙ্গলে। মনে আছে তোমার , মহুয়ার গন্ধে কেমন মাথা ধরে যাচ্ছিল! এক আদিবাসী মা এসে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন — মাঝে মাঝে রাতে এসে হাতির দল সব খেয়ে যায়, আর যাওয়ার সময় তছনছ করে দিয়ে যায়।”- সব কথা লেখা আছে সেই চিঠিতে। এত সংগ্রাম, এত লড়াইয়ের মাঝে তবু সুখ আছে এই ভেবে — জঙ্গলের বুনো ফুল আজ বিশ্বমঞ্চে আদৃত। আজ আর ‘ দেশি মদ ‘ বলে হেয় করার চেষ্টা করলেও তা কিন্তু দেশ পেরিয়ে অন্য দেশে ‘ বিদেশি ‘!
শেষে আবারও কাজী নজরুল ইসলামের আর একটি গানের কথা মনে পড়ে গেলো —–” মহুয়া ফুলের মদির ঘন সুবাসে, / নয়ন ঝিমিয়ে আসে / মাতাল পাপিয়া ‘পিয়া পিয়া’ ডাকে / দোলন-চাঁপার ঝুলন শাখে, / ঝিরিঝিরি হাওয়ায় মন উদাসে!”
Very good