ইতিহাসের পাতায় থেকে গেলেন “দিদিমণি” – প্রয়াত জব্দা বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠের অশ্রুকণা দাস
অলকেশ মাইতি, পটাশপুর,২২ জুলাই ,muthokotha.in: একটা গোটা প্রজন্মের শৈশব, ইতিহাসের ক্লাস আর খেলার মাঠ আজ নিঃসঙ্গ। দীর্ঘদিন দুরারোগ্য ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করার পর বুধবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন জব্দা বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠের ইতিহাসের শিক্ষিকা অশ্রুকণা দাস। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।
তাঁর প্রয়াণের খবরে পটাশপুর ২ ব্লক জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শুধু একটি স্কুল নয়, গোটা এলাকার মানুষ হারালেন এক “দরদী দিদিমণিকে”।
অশ্রুকণা দেবী ছিলেন ইতিহাসের শিক্ষিকা। কিন্তু তাঁর পরিচয় শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে আটকে থাকেনি। ইতিহাসের জটিল অধ্যায় যেমন সহজ করে বোঝাতেন, তেমনই স্কুলের শারীরিক শিক্ষার ক্লাসও তিনিই দেখতেন। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সরস্বতী পুজো, রবীন্দ্র জয়ন্তী – স্কুলের প্রতিটি অনুষ্ঠানে তাঁর ব্যস্ততা চোখে পড়ত।
২০২১ সালে বিদ্যালয় থেকে অবসর নেন তিনি। কিন্তু অবসরের পরেও তাঁর সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি। পড়াশোনার সমস্যা, ভর্তি, এমনকি ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়েও প্রাক্তনীরা ছুটে যেতেন কাঁথির বাড়িতে “দিদিমণির” কাছে।
স্কুলের সহকর্মী সুকুমার জানা কান্নাজড়ানো গলায় বলেন, “অশ্রুকণাদি মানে ছিল মমতা। কোনো ছাত্র স্কুলে না এলে নিজে খোঁজ নিতেন। কার বাড়িতে কী সমস্যা, সব মুখস্থ ছিল তাঁর। অসুস্থ ছাত্রকে দেখতে বাড়ি যেতেন, অভাবী ছাত্রের বই-খাতার ব্যবস্থা করে দিতেন। এমন দরদী শিক্ষিকা আজকাল খুব একটা পাওয়া যায় না।”
প্রায় ৪ বছর ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে যুঝছিলেন তিনি। কেমো, রেডিয়েশন নিতে নিতে – শরীর ভেঙেছে, কিন্তু মন ভাঙেনি। চিকিৎসার ফাঁকেও ফোন করে প্রাক্তন ছাত্রদের খবর নিতেন। “পরীক্ষা কেমন হল রে?” – এই প্রশ্নটা শেষ দিন পর্যন্ত ছিল।
বুধবার সকালে সূর্য ওঠার পর সেই শিখাটা নিভে গেল। কিন্তু আলোর জ্যোতি থেকে গেল পটাশপুর জুড়ে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জব্দা বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠের গেটে জমতে শুরু করে ভিড়। বর্তমান ছাত্র, প্রাক্তনী, অভিভাবক, সহকর্মী – সবার চোখে নেমে আসে জল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে আসছে শোকবার্তা। প্রাক্তন ছাত্রদের অনেকেই লিখেছেন, “আপনি শুধু ইতিহাস পড়াননি, মানুষ হতে শিখিয়েছেন।”
কাঁথি শহরে ছিল তাঁর স্থায়ী বাসস্থান। স্বামী অনল দাস পেশায় স্বাস্থ্যকর্মী এবং এলাকার পরিচিত একজন সমাজকর্মী। করোনার সময়েও তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
অশ্রুকণা দেবীর পরিবার যেন সেবার আরেক নাম। তাঁর
ছেলে একজন পশু চিকিৎসক। গ্রামের গবাদি পশুর চিকিৎসা করে বেড়ান। তাঁর পুত্রবধূ একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। শাশুড়ির পথই অনুসরণ করেছেন।
মেয়ে কলকাতার চিত্তরঞ্জন মেডিক্যাল কলেজের বিএসসি নার্স। কোভিড ওয়ার্ডে কাজ করেছেন তাঁর তাঁর মেয়ে। অশ্রুকণা দেবীর জামাতা কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
একটি পরিবার, চারজন – চারজনই মানুষের সেবায় ব্রতী। অশ্রুকণা দেবী শুধু নিজে শিক্ষা দেননি, গোটা পরিবারকে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত করে গেছেন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আজ স্কুল ছুটি ঘোষণা করেছে। আগামী শুক্রবার স্কুল প্রাঙ্গণে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে শোকসভার আয়োজন করা হবে। সেদিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে এবং এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে প্রার্থনার মাধ্যমে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, “উনি আমাদের সহকর্মী ছিলেন না, ছিলেন অভিভাবক। ওঁর শূন্যস্থান পূরণ হওয়ার নয়।”
ইতিহাস পড়াতে পড়াতে যিনি শত শত ছাত্রের জীবনের ইতিহাস লিখে দিয়েছিলেন, আজ তিনি নিজেই ইতিহাস হয়ে গেলেন। জব্দা বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠের বারান্দায়, ক্লাস সিক্সের ইতিহাসের বইয়ে, খেলার মাঠের সাইরেনে – সর্বত্র রয়ে যাবেন “অশ্রুকণা দিদিমণি”।
মৃত্যু শরীরের হয়, আদর্শের নয়। অশ্রুকণা দাস শিখিয়েছিলেন – মানুষ হও, মানুষের পাশে থাকো। সেই শিক্ষাই তাঁর সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ।