১ আগস্ট, কলকাতা,muthokotha.in: শনিবার বিকেল। রবীন্দ্রসদনের অডিটোরিয়াম কানায় কানায় ভরা। মঞ্চের পিছনে বড় করে লেখা — ‘ফেরা’। আর সেই ‘ফেরা’-র নায়িকা মঞ্চে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ছেন। প্রায় দু’দশক পর নিজের দ্বিতীয় বাড়ি কলকাতার মাটিতে পা রেখে কবিতা পড়ছেন বিশিষ্ট কবি ও লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
এই ঐতিহাসিক সন্ধ্যাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুললেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্বয়ং উপস্থিত থেকে তসলিমাকে স্বাগত জানালেন। উপহার হিসেবে তুলে দিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি। বললেন, “শৃঙ্খল মুক্ত, বাঁধন মুক্ত পশ্চিমবঙ্গে লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে স্বাগত।”
অনুষ্ঠানের নামই বলে দিচ্ছিল সব কথা। ‘ফেরা’। মৌলবাদ-বিরোধী কবি-সাহিত্যিকদের এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল কয়েকটি প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন।
২০০৭ সালে ‘দ্বিখণ্ডিত’ বিতর্কের পর যে লেখিকাকে শহর ছাড়তে হয়েছিল, তিনি ২০২৬ সালের ১ আগস্ট বিকেলে আবার রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে। দর্শকাসনে তখন কার্যত পিন পড়লেও নীরবতা। সকলের চোখ মঞ্চের দিকে।
বাঙালিয়ানার শাড়ি, কপালে ছোট টিপ। মাইক হাতে নিয়ে তসলিমা যখন প্রথম কবিতা পড়া শুরু করলেন, গলা কেঁপে উঠছিল। কবিতা শেষে দীর্ঘ করতালি। চোখে জল, ঠোঁটে হাসি। তিনি শুধু বললেন, “আমি বাড়ি ফিরেছি।”
অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ পর্যায়ে মঞ্চে ওঠেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁকে দেখেই হল জুড়ে আবার করতালি।
সংক্ষিপ্ত ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বাংলা সহিষ্ণুতার বাংলা। বাংলা যুক্তির বাংলা। বাংলা কখনও কলমকে ভয় পায় না। আজ ২০ বছর পর আমাদের বোন তসলিমা নাসরিন নিজের ঘরে ফিরেছেন। এটা পশ্চিমবঙ্গের জন্য গর্বের দিন।”
এরপর তিনি তসলিমার হাতে তুলে দেন ‘বন্দে মাতরম’-এর রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি ফ্রেম করা প্রতিকৃতি। বলেন, “বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের শিখিয়েছেন প্রশ্ন করতে। তসলিমাও সারাজীবন প্রশ্ন করেছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। এই প্রতিকৃতি তাঁর হাতে তুলে দিয়ে আমরা বাংলার সেই চেতনাকেই সম্মান জানালাম।”
মুখ্যমন্ত্রীর শুরুর লাইন ছিল সবচেয়ে আলোচিত — “শৃঙ্খল মুক্ত, বাঁধন মুক্ত পশ্চিমবঙ্গে লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে স্বাগত।”
২০০৭ থেকে ২০২৬ একটি দীর্ঘ রাতের অবসান ঘটেছে তাঁর জীবনে। ১৯ বছরের এই সময়টা কম নয়। ২০০৭ সালে ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাস প্রকাশের পর কলকাতা উত্তাল হয়েছিল। কট্টরপন্থীদের প্রতিবাদ, অশান্তি, কারফিউ। তৎকালীন সরকার বই নিষিদ্ধ করেছিল, তসলিমাকে শহর ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
সেই ক্ষত বয়ে বেড়িয়েছেন তসলিমা। নির্বাসনে থেকেছেন দেশে দেশে। লিখেছেন, প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু কলকাতা, তাঁর ভালোবাসার শহর, অধরাই থেকে গিয়েছিল।
শুক্রবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে দমদম বিমানবন্দরে পা রাখার পরই তিনি বলেছিলেন, “খুবই ভালো লাগছে।” আর শনিবার সেই ‘ভালো লাগা’ পূর্ণতা পেল রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে।
‘ফেরা’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা। মঞ্চে তসলিমার পাশে বসেছিলেন প্রবীণ সাহিত্যিকেরা। সকলেই একবাক্যে বলেছেন, এটা শুধু একজন লেখিকার ফেরা নয়, এটা বাক-স্বাধীনতার জয়।
তসলিমা তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আমি কোনও দলের নই। আমি শুধু কলমের। যেখানে যুক্তি আছে, যেখানে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা আছে, সেটাই আমার দেশ। আজ কলকাতা আমাকে সেই স্বাধীনতাটুকু ফিরিয়ে দিল।”
মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া উপহার নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা উঠতেই পারে। বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতির সমালোচক। তাঁর ‘আনন্দমঠ’, ‘কৃষ্ণচরিত্র’ আজও বিতর্ক তৈরি করে।
একজন বিতর্কিত লেখিকার হাতে বঙ্কিমের প্রতিকৃতি তুলে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কার্যত বার্তা দিলেন — পশ্চিমবঙ্গ বিতর্ককে ভয় পায় না, বরং বিতর্কের মধ্য দিয়েই এগোয়। এটা ‘নতুন সরকারের নতুন সংস্কৃতি নীতি’-রও ইঙ্গিত বলে মনে করছেন অনেকে।
রবীন্দ্রসদনের বাইরে তখন উৎসুক জনতা। ভিতরে যারা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
কলেজ পড়ুয়া অঙ্কিতা মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমরা বইয়ে তসলিমার নাম পড়েছি ‘নিষিদ্ধ লেখিকা’ হিসেবে। আজ তাঁকে লাইভ কবিতা পড়তে দেখলাম। এটা আমাদের প্রজন্মের জন্য বড় পাওয়া।”
তসলিমা জানিয়েছেন, তিনি কয়েকদিন কলকাতায় থাকবেন। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করবেন, বইপাড়ায় যাবেন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তাঁর নতুন কবিতার বইও প্রকাশিত হবে কলকাতা থেকে।