“অভাব ছিল, হার মানেনি: বাসনওয়ালার ছেলে বেলপাহাড়ির দেবকুমার আজ খড়গপুর IIT-র গবেষক”
১ আগস্ট, ঝাড়গ্রাম, muthokotha.in: স্বপ্ন দেখতে কে না চায়! স্বপ্ন দেখতে পয়সাও লাগে না, লাগে কেবল ইচ্ছে শক্তি আর সাহস। এই কথাটাই আরও একবার সত্যি করে দেখালেন ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি ব্লকের প্রত্যন্ত জাড়দা গ্রামের দেবকুমার সিংহ।
যে বাড়ির কর্তা রোজ বাড়ি বাড়ি ঘুরে অ্যালুমিনিয়ামের বাসন বিক্রি করে সংসার চালান, সেই বাড়ির ছেলেই আজ খড়গপুর IIT-র গবেষক। অভাব, অনটন, লোকের কথা — কিছুই আটকাতে পারেনি ২৫ বছরের এই যুবককে। ছেলের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করবার অদম্য লড়াই লড়ে গেলেন বাবা।
” বাসন লাগবে গো—বাসন ! স্টিলের হাতা, খুন্তি, চামচ, বাটি, গ্লাস, থালা। আরও পাবেন অ্যালুমিনিয়ামের বাসন। সস্তা দাম — সহজে পান। বাসন লাগবে গো—বাসন….! “
দেবকুমারের বাবা লক্ষ্মীকান্ত সিংহ ভোরের আলো ফুটলেই সাইকেলে বাসন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন গ্রামে গ্রামে। গ্রামে গ্রামে ফেরি করে যা আয়, তাই দিয়ে চলে তিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনা।
বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন লক্ষ্মীকান্ত। ছোট ছেলে প্রদ্যুৎ কুমারের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার । মেধাবী প্রদ্যোৎ গত বছর সুযোগ পেয়েছে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে MBBS-এ। আর মেজো ছেলে দেবকুমার বেছে নিয়েছিল অন্য লড়াই। সে লড়াই তাকে জিততেই হবে। যেমন ছিল জেদ, তেমনই ছিল প্রতিভা। মা রিনা সিংহ বলেন, “অনেক কষ্ট হয়েছে। কিন্তু ছেলেটা ছোট থেকে বলত, ‘আমি পড়ব, বড় হব।’ বড়ো হওয়ার সেই সিঁড়ির ধাপগুলো একটা একটা করে ছুঁয়ে যাচ্ছে দেবকুমার।
জাড়দা থেকে খড়গপুর — লম্বা রাস্তা ! খুব একটা সহজ ছিল না, কিন্তু ইচ্ছা শক্তির কাছে দূর হয়ে গেল নিকট। দেবকুমারের পড়াশোনা শুরু জাড়দা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। তারপর মুড়ারী SC উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। ২০১৯ সালে সেখান থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন।
তারপর থেমে থাকেননি এক মুহূর্তের জন্যও। তিনি ভূগোল বিষয়ে স্নাতক করেন হলদিয়া গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে , আর স্নাতকোত্তর করেন কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
গত ২৩ জুলাই এল সেই দিন। বাবা-মাকে পাশে নিয়ে ভর্তি হলেন খড়গপুর IIT-র “Centre for Rural Development and Innovative Sustainable Technology [ CRDIST ]”-তে। ভর্তির দিন ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে বাবার চোখে ছিল জল , শুধু অশ্রু নয়, গর্বও ছিল।
IIT-তে দেবকুমার গবেষণা করবেন গ্রামীণ উন্নয়ন ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নিয়ে। নিজের চোখে দেখা গ্রামের সমস্যা, জল, কৃষি, স্বাস্থ্য, রাস্তা — এই সবকিছুর সমাধানে বিজ্ঞানকে কাজে লাগানোই তাঁর লক্ষ্য।
একবুক আশা নিয়ে দেবকুমার বললেন — “আমি যে কষ্ট দেখেছি, আমার গ্রাম যে কষ্ট দেখেছে, সেটা যাতে আর কাউকে দেখতে না হয়। প্রযুক্তি দিয়ে যদি গ্রামের মানুষের জীবন একটু সহজ করা যায়, সেটাই আমার স্বপ্ন,! এই পথ চলায় সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন মুড়ারী SC স্কুলের ভূগোল শিক্ষক অচিন্ত্য সরকার স্যার । স্যার না থাকলে আমি হয়তো মাঝপথেই থেমে যেতাম।”
দেবকুমারের এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই জাড়দা গ্রাম থেকে গোটা বেলপাহাড়ি জুড়ে খুশির মেজাজ। স্কুলের মাস্টারমশাইরা মিষ্টি বিলি করছেন। পাড়ার কাকু-জেঠুরা বলছেন, “আমাদের ছেলে IIT-তে গেছে।”
মুখে মুখে এখন একটাই চর্চা, চোখে চোখে একটাই ছবি–” একজন বাসনওয়ালা বাবা আর IIT-র গবেষক ছেলে। ” হ্যাঁ , এই ছবিটা শুধু একটা পরিবারের গল্প নয়। এটা হাজারো প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলেমেয়ের কাছে একটা প্রেরণা।
অভাব ছিল, তাই বলে স্বপ্নকে কখনোই ছোট করেননি দেবকুমার। আজ তিনি প্রমাণ করলেন, মাটির গন্ধ গায়ে মেখেও আকাশ ছোঁয়া যায়। আকাশের স্নিগ্ধতায় চোখ মেলে এগিয়ে যাওয়া যায়।