৩১ জুলাই, muthokotha.in : “বাবু গো, সিঁদুরের দাম অনেক” — যে কণ্ঠে লক্ষ দর্শক কেঁদেছিল, সেই কণ্ঠ আজ স্তব্ধ। যাত্রাজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র অসীম কুমার শুক্রবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তিনি পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যাত্রা মঞ্চ মাতিয়ে রেখেছিলেন । তাঁকে ‘যাত্রা সূর্য’ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। প্রবীণ এই অভিনেতা রেখে গেলেন অসংখ্য স্মৃতি আর একটা গোটা যুগের রূপকথার গল্প।
অভিনয় জগতে খুব অল্প বয়সেই এসেছিলেন তিনি। চিৎপুরের রাজপুত্র থেকে যাত্রার সম্রাট হয়ে উঠতে তাঁর বেশি খুব সময় লাগেনি। এই অবিসংবাদিত অভিনেতার জন্ম তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জের ননীতীর গ্রামে। দেশভাগের কষ্ট মাথায় নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় এসেছিলেন অভিনেতা। অভাবের সংসার, পড়াশোনা বেশি দূর করতে পারেননি,কিন্তু থেমে থাকেননি কোনোদিন। সংগীত ও অভিনয় ছিল তাঁর খুব প্রিয় বিষয়।
অপেশাদার দল থেকে তাঁর অভিনয় শুরু, তারপর একসময় নজরে পড়লেন নাট্যকার শশাঙ্ক শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁর হাত ধরেই ১৯৬৪ সাল নাগাদ ‘শতরূপা নাট্য গোষ্ঠী’তে ‘চূয়া চন্দন’ নাটকে চন্দন চরিত্রে পেশাদারিত্বের সঙ্গে অভিনয়ের মাধ্যমে যাত্রাকাশে আত্মপ্রকাশ করেন।
এরপর আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে বহু সংস্থায় তিনি তাঁর সুদক্ষ ছাপ ফেলেছেন। ‘নাট্যভারতী’, ‘শ্রীমা’, ‘অম্বিকা’, ‘শ্রীরাধা’, ‘নিউ গণেশ অপেরা’, ‘মোহন অপেরা’, ‘লোকশিল্প’— চিৎপুরের প্রায় সব নামী দলেই তিনি রাজত্ব করেছেন। তাঁর অভিনয় মানেই একটি চমক। ‘অসীম কুমার’ নামেতেই যাত্রা বুকিং হতো একটা সময়।
যাত্রা মঞ্চের তিন মহীরুহ,– জ্যোৎস্না দত্ত, বীণা দাশগুপ্তা আর বেলা সরকার। এই তিনজনেরই বিপরীতে নায়ক হয়েছেন অসীম কুমার। ১৯৭৩ সালে বীণা দাশগুপ্তার সঙ্গে বিজন থিয়েটারে ‘নটী বিনোদিনী’তে গিরিশ ঘোষ চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও যাত্রা প্রেমীদের মুখে মুখে।
‘বিবি আনন্দময়ী’র রবিশঙ্কর, ‘সতী তুলসী’র শঙ্খচূড়, ‘বাঁদী লালবাঈ’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘ডাক হরকরা’, ‘লাঞ্ছিতা জননী’ — একের পর এক কালজয়ী পালায় তিনি প্রমাণ করেছেন, যাত্রা শুধু অভিনয় নয়, এটা সাধনা।
ডে লাইটের রাতের আসর থেকে আধুনিক সাইক্লোরোমার আলো — সব যুগেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। ২০১৪ সালে শেষবার পেশাদার মঞ্চে নামেন। সহধর্মিনী সীমা বোস নিজেও একজন বলিষ্ঠ যাত্রা অভিনেত্রী। দু’জনে মিলে যাত্রাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
অসংখ্য সম্মান, পুরস্কারে ভূষিত অসীম কুমার শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন যাত্রার ইতিহাস।
চিৎপুরের মঞ্চ আজ শূন্য। আলো নিভে গেছে, কিন্তু ‘সূর্য’র আলো দর্শকের হৃদয়ে রয়ে যাবে চিরকাল। অনন্তকাল ধরে আকাশে বাতাসে শোনা যাবে —” বাবু গো সিঁদুরের দাম অনেক!”