অলকেশ মাইতি, ৩১জুলাই, muthokotha.in: সময় কখনোই থেমে থাকে না। কিন্তু কিছু ফেরা, সময়ের চেয়েও ভারী হয়ে যায়। শুক্রবার বেলা ১২টা ৫০ মিনিট নাগাদ দমদম বিমানবন্দরের গেট দিয়ে যখন তিনি হেঁটে এলেন, তখন ক্যামেরার ফ্ল্যাশ নয়, কলকাতার বাতাসটাই যেন আবেগে কেঁপে উঠল। তসলিমা যেন ফিরলেন নিজের বাড়ি। প্রায় ২০ বছর পর নিজের দ্বিতীয় বাড়ি কলকাতায়। বাংলার আকাশ আর গঙ্গার বাতাস স্বাগত জানালো এই বিখ্যাত লেখিকাকে।
সকালেই তিনি নিজের সোশাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন — ‘আজি এ প্রভাতে কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করিলাম।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় নিজের ফেরার কথা জানিয়েছিলেন । কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই কথা সত্যি হল। তবে কয়েকদিন আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল — ‘ তিনি আসছেন ‘!
বিমানবন্দরে নামা মাত্রই সেই চেনা হাসিমুখ। তবে চোখে আনন্দের জল, আর ঠোঁটে বিশ্বাস ও তৃপ্তির হাসি। সাংবাদিকদের শুধু বললেন, “খুবই ভালো লাগছে।” এই ছোট্ট বাক্যের ভেতর জমে ছিল দু’দশকের অপেক্ষা, যন্ত্রণা আর ভালোবাসা।
সালটি ছিল ২০০৭ ! ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাস প্রকাশের পর কলকাতা উত্তাল হয়ে উঠেছিল। কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে তাঁর কলমের আগুনে শহর কেঁপে উঠেছিল সেদিন। সেই আগুনের শিখায় অশান্তি, কারফিউ, শেষে সেনা মোতায়েন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তখন ত্রিমুখী চাপে পড়ে গেছেন। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের আন্দোলন তখন তাজা। আর তারই মধ্যে ‘তসলিমা বাংলা ছাড়ো’ আন্দোলনে তৎকালীন প্রশাসন একপ্রকার চাপে পড়ে ‘ দ্বিখণ্ডিত’ বই নিষিদ্ধ করে এবং লেখিকাকে শহর ছাড়তে বলে।
বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর যে কলকাতা একদিন তাঁকে মাথায় তুলে নিয়েছিল, সেই কলকাতাকেই সেদিন পেছনে ফেলে চলে যেতে হয়েছিল নীরবে। বামপন্থার ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশের আড়ালে বাংলার সাহিত্য আকাশে সেদিন নেমে এসেছিল এক দীর্ঘ রাত। তারপর কেটে গেছে ১৯ বছর। ১৯ বছর পরে আজ সেই রাত সকাল হলো। প্রায় দুই দশক পর আবার কলকাতা তাঁকে স্বাগত জানালো। শুক্রবারের কলকাতা তাঁকে আবার বরণ করে নিল।
শনিবার রবীন্দ্রসদনে মৌলবাদ-বিরোধী কবি-সাহিত্যিকদের এক অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দেবেন। কলম যার অস্ত্র, যুক্তি যার ভাষা — সেই তসলিমা আবার মঞ্চে দাঁড়াবেন, এই শহরের বুকেই। এখন নজর থাকবে তাঁর ‘কথা’র দিকে।