স্বাধীনতা সংগ্রামে পটাশপুরের অগ্নিকন্যারা: ১৯৩২-এর আইন অমান্যে নারীর আত্মবিসর্জন
১৪ আগস্ট, পটাশপুর, muthokotha.in : স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্তৃত ইতিহাসে পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের নাম জ্বলজ্বল করে ওঠে । স্বাধীনতা আন্দোলনে এখানকার মেয়েদের সাহস এবং ত্যাগ এখানকার মানুষজন কখনোই বিস্মৃত হবেন না। ১৯৩২ সালের দ্বিতীয় দফার আইন অমান্য আন্দোলন যখন শুরু হলো, তখন পটাশপুরের রমণীরা যে ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা শুধু জেলা নয়, গোটা বাংলার আন্দোলনকে নতুন শক্তি জুগিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র পটাশপুরের মহিলাদের সাহসীকতার নমুনা ছড়িয়ে পড়েছিল। গান্ধীজির ডাকে আইন অমান্য আন্দোলনের জোয়ার তখন পটাশপুর জুড়ে বইতে শুরু করেছে। বাল্যগোবিন্দপুরের একটি জনসভা থেকে মঙ্গলামাড়োর কংগ্রেস অফিস দখল – প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল নারীর প্রত্যয়, আর সেই প্রত্যয়ই এগিয়ে নিয়ে যায় আন্দোলনকারীদের।
১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গান্ধী-আরউইন চুক্তির পর প্রায় ১০ মাস স্তিমিত ছিল আইন অমান্য আন্দোলন। সেপ্টেম্বরে লন্ডনের দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার পুনরায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করে। ১৯৩২-এর ৪ জানুয়ারি দমনমূলক অর্ডিন্যান্স জারি করে এক রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু-সহ জাতীয় নেতৃত্বকে। আন্দোলনকে পর্যুদস্ত করবার জন্য ব্রিটিশ সরকার একপ্রকার আদাজল খেয়ে উঠেপড়ে লেগেছে।
তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জেলে গেলেও সংগ্রামকে থামিয়ে রাখা যায়নি। জয়প্রকাশ নারায়ণ, অচ্যুত পটবর্ধনের মতো তরুণ সমাজতান্ত্রিক নেতাদের হাত ধরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউ। এই ঢেউয়ে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল কৃষক ও নারী সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান। জাতীয় আন্দোলনের এই হাওয়া এসে লাগে মেদিনীপুরের ( অবিভক্ত ) পটাশপুরেও।
এই আন্দোলন কর্মসূচির পুরোভাগে ছিলেন পটাশপুরের সুখদাময়ী রায়চৌধুরী। প্রশাসন যখন জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে, তখন সুখদাময়ী সিদ্ধান্ত নিলেন বাল্যগোবিন্দপুর গ্রামে একটি সভা করবেন এবং সেই সভায় নিজ এলাকা। ম্যাজিস্ট্রেটকে আগাম চিঠি দিয়ে তিনি লিখলেন – “যে শাসনে স্বামীকে বাড়িতে জায়গা দিলে স্ত্রীকে শাস্তি পেতে হয়, যে আইনে দেশের সন্তানকে সাহায্য করাটা অপরাধ, সেই আইন কোনো মায়ের মানা উচিত নয়।”
এই চিঠি ছিল ব্রিটিশের মুখে চপেটাঘাত। ক্ষুব্ধ প্রশাসন ১৯৩২-এর ৩ এপ্রিল সুখদাময়ী ও তাঁর স্বামী আশুতোষ রায়চৌধুরীকে ধরে নিয়ে ৯ মাসের কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু তাতেও সভা বন্ধ হয়নি। নেতৃত্বে ছিলেন ইন্দ্রমণি দাস। তাঁর পরিচালনায় নির্ধারিত সময়েই জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সুখদাময়ীর অনুপস্থিতি জনতার কণ্ঠ রোধ করতে পারেনি।
ঐতিহাসিক তথা আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক মন্মথনাথ দাস লিখেছেন — ” একই সময়ে আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। ব্রিটিশ সরকার যেটিকে বেআইনি ঘোষণা করেছিল, সেই মঙ্গলামাড়ো কংগ্রেস অফিসের তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন কুসুম কুমারী মণ্ডল। একা নন, তাঁর সঙ্গে ছিলেন এলাকার অসংখ্য স্বদেশি। এই পর্বে উদয়নারায়ণ মিশ্র, বরেন্দ্রনাথ সাঁতরা, লালমোহন প্রামাণিক, গোবিন্দপ্রসাদ বাগ-সহ বহু মানুষকে জেলে যেতে হয়।”
কুসুম কুমারীর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে দেয় যে, স্বাধীনতা লাভের জন্য আইন অমান্য করা শুধুমাত্র পুরুষদের কাজ নয়, মহিলারাও রাষ্ট্রের অন্যায় হুকুম মানতে নারাজ, মহিলারাও দেশের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করতে পারে।
১৯৩২-এর আন্দোলনের একটি বড় ইস্যু ছিল অতিরিক্ত খাজনা ও কর। ১৯৩৩ সালের প্রথম তিন-চার মাসে পটাশপুর জুড়ে শুরু হয় পুলিশি অভিযান। কর না দেওয়ার “অপরাধে” শতাধিক বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ। ধান-চাল তো বটেই, তালিকায় ছিল গৃহস্থের দুধেল গাই, হালের বলদ পর্যন্ত। মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।
কিন্তু এই অত্যাচার মানুষকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে দেয়। পুলিশের লাঠি, জেলের ভয় উপেক্ষা করেই গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিরোধের বার্তা।
ইতিহাসের পাতায় পটাশপুরের আন্দোলনের মুখ হয়ে আছেন পাঁচজন নারী। তাঁরা হলেন
১) সুখদাময়ী রায়চৌধুরী: নির্ভীক নেত্রী, ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রতীক
২) কুসুম কুমারী মণ্ডল : নিষিদ্ধ অফিস দখলের নায়িকা
৩) রতনমণি দাসমহাপাত্র
৪) সরস্বতী মিত্র
৫) শরৎ কুমারী কানুনগো
শুধু পটাশপুর নয়, পাশের ভগবানপুর থানা থেকেও এই লড়াইয়ে সামিল হন ধীরা দাস ও সৌদামিনী পাহাড়ী। পুরুষশাসিত সমাজে দাঁড়িয়ে গ্রেপ্তার, প্রহার সব সহ্য করেও তাঁরা পিছিয়ে আসেননি। তাঁদের এই আত্মত্যাগ গোটা এলাকার মানুষকে নতুন করে লড়তে শিখিয়েছিল।
পটাশপুরের এই আন্দোলনের আরেকটি দিক ছিল সামাজিক সংস্কার। নেতৃত্ব দেন সমাজসেবী দিগিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য। তাঁর উদ্যোগে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে সর্বজনীন দুর্গাপুজো ও পংক্তিভোজনের আয়োজন হয়। এতে সহযোগিতা করেন প্রসন্নকুমার ত্রিপাঠী ও উদয়নারায়ণ মিশ্রের মতো ব্যক্তিত্বরা। জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এইধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ ছিল নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদক্ষেপ।
এই সময়েই জব্দায় গড়ে ওঠে ‘হরিজন প্রাথমিক বিদ্যালয়’। একই সঙ্গে জোর দেওয়া হয় চরকায় সুতো কাটা ও খাদির প্রচারে। আন্দোলন মানে শুধু ব্রিটিশ বিরোধিতা নয়, সমাজের ভেতরের বৈষম্য ভাঙারও প্রয়োজন আছে। ভেতর ও বাহিরের পরিবর্তন না হলে বিপ্লব অসম্ভব বলেই মনে করতেন আন্দোলনকারীরা।
এখন দেশ স্বাধীন। ১৯৩২ সালের সেই দিনগুলো আজ অতীত। কিন্তু পটাশপুরের মাটিতে সুখদাময়ী, কুসুম কুমারীদের রেখে যাওয়া পথচিহ্ন আজও মুছে যায়নি। গ্রেপ্তার, জেল, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত – কোনো কিছুই তাঁদের দমাতে পারেনি।
ইতিহাস বলছে, কোনো আন্দোলনই শুধু নেতাদের দিয়ে বাঁচে না। তাকে বাঁচিয়ে রাখে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ঘরের মেয়েদের ত্যাগ। পটাশপুরের এই পাঁচ অগ্নিকন্যা ও তাঁদের সাথীরা সেই সত্যিটাই প্রমাণ করে গেছেন।
আজ যখন আমরা স্বাধীন ভারতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব উদযাপন করছি, ঘরে ঘরে তিরঙ্গা পৌঁছে দিচ্ছি, তখন পটাশপুরের এই বীরগাথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় —– দেশ গড়ার কাজে নারীর ভূমিকা কোনোদিনও ছোট ছিল না। বরং তাঁরাই ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক।