৬ আগস্ট, muthokotha.in: বুধবার রাত। বাংলার লোকসংগীত জগতে নেমে এলো শোকের ছায়া। প্রয়াত হলেন লোকগীতির প্রবাদপ্রতিম গায়ক স্বাগত দে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫০-এর কাছাকাছি। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। খবরটি প্রথম নিশ্চিত করেন অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “স্বাগত দা… গায়ক স্বাগত দে… আর নেই। কেমন যেন হয়ে গেলাম খবর টা পেয়ে..! ছোটবেলাটা ফিরে এলো… Flash Back এর মত।”
একটি গোটা প্রজন্ম যাঁর গলায় “ময়না ছলাৎ ছলাৎ করে রে” শুনে বড় হয়েছে, তাঁর আকস্মিক প্রস্থানে স্তব্ধ সঙ্গীতমহল।
“ময়না” থেকে “সোনা বন্ধু” — নতুন প্রজন্মের কাছে লোকগানের দূত ছিলেন স্বাগত। তিনি ছিলেন সেই শিল্পী যিনি মাটির গন্ধ মাখা লোকগানকে শহরের মঞ্চে, ইউটিউবে, নতুন প্রজন্মের প্লেলিস্টে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কোমর দুলিয়ে লোকগানের তালে তালে এই প্রজন্মকে নাচতে শিখিয়েছিলেন শিল্পী।
“ময়না ছলাৎ ছলাৎ করে রে পিছন পানে চায়না রে” — এই গানটি তাঁর কণ্ঠে নতুন করে প্রাণ পায়। গ্রামের মেলার গান, বিয়ের গীত, ভাটিয়ালি — সবই তাঁর গলায় আধুনিক অথচ শেকড়-আঁকড়ে থাকা রূপ পেত। “সোনা বন্ধু রে”, “বিহুর এ লগন” এর মতো গানগুলো আজও বাঙালির অনুষ্ঠান বাড়িতে বাজে।
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল লোকগীতিকে “সেকেলে” তকমা থেকে বের করে এনে একালের আঙিনায় জাগিয়ে রাখা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন লোকগানও ট্রেন্ড হতে পারে, ভাইরাল হতে পারে। কলেজ ফেস্ট থেকে টিভির রিয়ালিটি শো — সর্বত্র তাঁর গান গাওয়া হত। খবর পাওয়ার পরেই শোক প্রকাশ করেন লোকশিল্পী দেব চৌধুরী। তিনি সংবাদ মাধ্যমে “ও তো আমাদের সমসাময়িক ছিল। খবরটা মেনে নিতে পারছি না। বড় ক্ষতি হয়ে গেল আমাদের।”
সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার এবং বহু নতুন শিল্পী সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। অনেকে লিখেছেন, “স্বাগত দা-র গান না শুনলে লোকগানের ক্লাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।”
অবসাদের অন্ধকার ও শেষ সময় বুঝি এভাবেই আসে? দীর্ঘদিন ধরে একটি অন্ধকার তাঁকে গ্রাস করেছিল বলে তাঁর বন্ধুমহল থেকে উঠে আসে।
স্বাগত দে-এর মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রথমে ধোঁয়াশা থাকলেও পরে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলি জানিয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। কিছুতেই সেই অন্ধকার থেকে তিনি বেরোতে পারলেন না।
করোনা মহামারির পর থেকেই তাঁর জীবনে নেমে আসে এই অন্ধকার। একদিকে কাজ কমে যাওয়া, অন্যদিকে মঞ্চ না পাওয়া। কেরিয়ারের শুরুর দিকে যে খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা তিনি পেয়েছিলেন, পরবর্তীতে তা ধরে রাখা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এই হতাশা থেকেই বাড়ে মদ্যপান। আর সেই মদ্যপানই তাঁকে কেড়ে নিল এই অল্প বয়সে।
ঘনিষ্ঠরা জানান, তিনি বারবার বলতেন — “মানুষ নতুন গান চায় না, নতুন মুখ চায়।” এই লড়াই, এই মানিয়ে নিতে না পারা তাঁকে ভিতর থেকে শেষ করে দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বুধবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর প্রয়াণ ঘটে।
স্বাগত দে শুধু একজন গায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সংগ্রাহক ও প্রচারক। বাংলার বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে তিনি হারিয়ে যাওয়া লোকগান তুলে আনতেন। সেই গানকে নতুন সুর ও আয়োজনে রেকর্ড করতেন।
তাঁর প্রয়াণে বাংলার লোকসংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ভেঙে গেল। যে সেতু গ্রামের বাউল, ভাটিয়ালি গায়কদের সঙ্গে শহরের শ্রোতাদের জুড়ে দিত। আগামী দিনে তাঁর মতো করে কে আর “মাটির গানকে” এত সহজ, এত প্রাণবন্ত করে পরিবেশন করবে — এই প্রশ্ন এখন সবার মনে।
তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই নেটমাধ্যম ভরে ওঠে শোকবার্তায়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে তাঁর গানের রিল, পুরনো কনসার্টের ভিডিও শেয়ার করছেন অনুরাগীরা। কমেন্টে বারবার ফিরে আসছে “ময়না ছলাৎ ছলাৎ” এর লাইন।
শিল্পী শীট লিখেছেন, “প্রিয় শিল্পী, আপনি চলে গেলেন কিন্তু আপনার ময়না আমাদের ছেড়ে যাবে না।” মৈত্রেয়ী মাইতি লিখেছেন, “করোনার পর অনেক শিল্পীই হারিয়ে গেছেন। স্বাগত দে তাঁদের মধ্যে অন্যতম।” স্বাগত দের অকাল প্রয়াণে লোকগানের ভীষণ ক্ষতি হলো। স্বাগত দে চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর গান থেকে যাবে। “পিছন পানে চায়না রে” বলা সেই ময়না হয়তো আর তাঁর গলায় শোনা যাবে না। কিন্তু প্রতিবার পুজো, বিয়ে বাড়িতে যখন কেউ এই গানটি গাইবে, তখন স্বাগত দে আবার ফিরে আসবেন।
তিনি প্রমাণ করে গিয়েছিলেন যে শেকড় ভুলে গেলে শিল্প বাঁচে না। আবার শুধু শেকড় আঁকড়ে থাকলেও আধুনিক শ্রোতার কাছে পৌঁছানো যায় না। এই দুইয়ের মেলবন্ধনই ছিল স্বাগত দে।