“নেশামুক্ত যুব, বিকশিত ভারত” : ২১ বছরের অপেক্ষা না অবিলম্বে পদক্ষেপ?
অলকেশ মাইতি, ৫ আগস্ট,muthokotha.in: ২০২৬ সালের ২ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী “Nasha Mukt Yuva for Viksit Bharat Sankalp Abhiyan” এর সূচনা করেন। ১০০ সপ্তাহব্যাপী এই দেশব্যাপী কর্মসূচির লক্ষ্য একটাই — ভারতের তরুণ প্রজন্মকে মাদকাসক্তি থেকে বাঁচিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখা। ২০৪৭ সালের মধ্যে “মাদকমুক্ত বিকশিত ভারত” গড়ার যে স্বপ্ন সরকার দেখাচ্ছে, তারই প্রথম ধাপ এটি। খেলাধুলা, সাইকেল র্যালি, পথনাটক, যোগ, ক্যুইজ ও সচেতনতা শিবিরের মাধ্যমে MY Bharat পোর্টাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিকে নিয়ে এই অভিযান শুরু হয়েছে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়।
কিন্তু এর পাশাপাশি একটি প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে — যদি লক্ষ্যটা এতটাই জরুরি হয়, তাহলে ২০৪৭ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ আরও ২১ বছর অপেক্ষা করতে হবে কেন?
১. সচেতনতাই প্রথম ধাপ:—
মাদকাসক্তি শুধু আইন দিয়ে থামানো যায় না। তরুণদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা জরুরি। খেলাধুলা ও যোগের মাধ্যমে বিকল্প জীবনশৈলী দেখানো, পথনাটকের মাধ্যমে পরিবারের ভাঙন তুলে ধরা — এগুলো দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে।
২. প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ: —-
MY Bharat পোর্টালের মাধ্যমে ১.৫ কোটি যুবককে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমরা জানি, স্কুল-কলেজকে যুক্ত করলে ‘সমবয়সীদের চাপ বা প্রভাব’ ভাঙা সম্ভব, যাকে আমরা চলতি কথায় বলি ‘সঙ্গদোষ’ ! এই ‘সঙ্গদোষ’ই এই মাদকাসক্তির মূল শক্তি কিংবা মূল প্রেরণা।
৩. ১০০ রবিবারের প্রতীকী গুরুত্ব:—
প্রতি রবিবার একটি করে কার্যক্রম মানে বিষয়টিকে জনমানসে ধারাবাহিক রাখা। একদিনের প্রচার করে মাদক থামে না। এই কারণেই অনেকেই এই অভিযানকে “দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ” হিসেবে দেখছেন।
কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মধ্যে ঘাটতি আসলেই সমস্যা আরও গভীর হবে।
“২০৪৭” লক্ষ্যমাত্রা — আশা না অজুহাত?
এখানেই আসে আসল খটকা। ২০৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার ১০০ বছর। “বিকশিত ভারত”-এর রূপরেখাও সেই বছরকে কেন্দ্র করে। তাই মাদকমুক্ত ভারতের লক্ষ্যও ২০৪৭-এ বাঁধা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হল, মাদক ও মদের কারণে প্রতিদিন যুবসমাজ ঝরে যাচ্ছে। পরিবার ভাঙছে, অপরাধ বাড়ছে, কর্মক্ষম যুবশক্তি নষ্ট হচ্ছে। এই অবস্থায় ২১ বছর পরের তারিখ দেওয়া মানে কি সমস্যার গুরুত্বকে হালকা করে দেওয়া নয়? তাহলে কি যুবসমাজ এতটাই বুঁদ হয়ে গেছে যে এই প্রবণতা থেকে তাদের বের করা একটি কঠিন কাজ?” উত্তরটা চলুন দুভাগে ভাগ করে দেখা যাক্।
কেন ২১ বছর লাগতে পারে — সরকারি যুক্তি :–
১. সামাজিক পরিবর্তন ধীর :
সচেতনতা থেকে আচরণ বদলাতে গেলে এক একটা প্রজন্ম লাগে। এই সচেতনতাই একসময় অভ্যাসে পরিণত হবে। আজকের যে ছেলেটি ১৫ বছর বয়সের , সেই ছেলেটি যখন ২০৪৭ সালে ৩৬ বছরের দায়িত্বশীল নাগরিক হবে। তখন সে মাদকহীন অভ্যাসের মধ্যে পড়ে গিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক ভাবেই বদলে ফেলেছে। তার কাছে মাদক কেবল একটি ইতিহাসের পাতা মাত্র। এই দীর্ঘমেয়াদি সময়সূচি দেখে মনে হচ্ছে সরকার “নতুন প্রজন্ম”কেই টার্গেট করছে।
২. অর্থনীতি ও রাজস্ব:—
মদ থেকে রাজ্য সরকারগুলি বিপুল রাজস্ব পায়। তাই হঠাৎ করে দোকান বন্ধ করলে রাজ্যের আয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের চাকরি যাবে । এছাড়া চোরাগোপ্তা মদের কারবার বাড়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। তাই সম্ভবত হঠাৎ করে কড়া পদক্ষেপের দিকে সরকার যেতে চাইছে না।
কারণ, শুধু দোকান বন্ধ করলেই সমস্যা মিটবে না। চাহিদা থাকলে চোরাপথে মাদক আসবেই। তাই হয়তো আগে মানুষের চাহিদা কমানো এবং তারপর যোগান বন্ধ করা, — এই নীতিই নিয়েছে সরকার। “ক্রেতা দোকানে না গেলে, দোকানদার ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হবে।”
কঠোর পদক্ষেপ কেন নয়? —–
সচেতনতা থাক্। সচেতনতার পাশাপাশি কিছু কিছু কড়া পদক্ষেপ, প্রশাসনিক নজরদারি, লাইসেন্স না দেওয়া ইত্যাদি না করলে এই ২১ বছরের সচেতনতার অভিযান “চোখের বালি” হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
১. যোগান বন্ধ না করলে চাহিদা কমবে কীভাবে?: প্রতি গলিতে মদের দোকান, অনলাইনে মাদকের বিজ্ঞাপন খোলা থাকলে সাইকেল র্যালি কতটা কাজ করবে? গুজরাট ও বিহারে আংশিক নিষেধাজ্ঞার উদাহরণ আছে। বিতর্ক থাকলেও নেশার পরিমাণ কমেছে।
২. লাইসেন্স নীতি পুনর্বিবেচনা: নতুন মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসনের ৫০ মিটারের মধ্যে দোকান নিষিদ্ধ — এই সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া যায়।
৩. কঠোর আইন প্রয়োগ:— যারা মাদক পাচারকারী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, দ্রুত বিচারের মাধ্যমে শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে, স্কুলের ১ কি.মি-র মধ্যে মাদক বিক্রি করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু “সচেতন হও” বললে পাচারকারী ভয় পাবে না। সচেতনতার পাশাপাশি চাই প্রশাসনিক অভিযান।
৪. বিকল্প কর্মসংস্থান:– যারা মদের দোকান ও সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত, তাদের জন্য সরকারি বিকল্প প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এখন থেকেই শুরু করা দরকার। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেই উপার্জনের জন্য মদের দোকানের প্রয়োজন হবে না।
অর্থাৎ সচেতনতা + কঠোরতা = এই দুই চাকায় ভর করেই ২১ বছরের পথ ১০ বছরে আনা সম্ভব।
যুবসমাজের ভূমিকা :–
এই অভিযানের সাফল্য শেষ পর্যন্ত যুবদের হাতেই। তাদের বোঝাতে হবে নেশা “Stylish” নয়, বরং দুর্বলতা। খেলাধুলা, স্টার্টআপ, শিল্পচর্চা — এগুলোকে “Cool” হিসেবে তুলে ধরতে হবে। পরিবার, শিক্ষক ও সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে — এই খবর রাখাটাও “Nasha Mukti”-র একটি অংশ। তাই সরকারি উদ্যোগ বা যুবকদের ভূমিকার সঙ্গে অভিভাবকদের অংশগ্রহণ বিরাট ভূমিকা পালন করবে।
অপেক্ষা নয়, আশু সমাধান:—
“Nasha Mukt Yuva” অভিযান একটি সঠিক দিশা। ১০ সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে সচেতনতা তৈরি করা খুব দরকারি কাজ। কিন্তু ২০৪৭ সালকে শেষ তারিখ করে দেওয়ায় মনে হচ্ছে যেন সমস্যাটি “ভবিষ্যতের”।
বাস্তবতা হল, সমস্যাটি “আজকের”। আজকের যে ছেলেটি নেশা ধরছে, সে ২০৪৭ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না। তাই সচেতনতার পাশাপাশি সরকারকে এখনই ৩টি কাজে হাত দিতে হবে:
১. যোগান নিয়ন্ত্রণ:–– মাদক ও অবৈধ মদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স করা, যোগান নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই কিন্তু ফলাফল শীঘ্রই পাওয়া যাবে।
২. নীতি পরিবর্তন: –— নতুন লাইসেন্সে রাশ টানতে হবে সরকারকে , বিজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে।
৩. পুনর্বাসন: মদে আসক্ত ব্যক্তিদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
তাহলেই “বিকশিত ভারত” এর স্বপ্ন ২০৪৭ এর জন্য তোলা থাকবে না। বরং ২০৩০ এর মধ্যেই আমরা বলতে পারব — আমাদের যুবসমাজ নেশামুক্ত, সবল ও দেশ গড়ার কারিগর।
পরিশেষে বলি, আশা রাখতেই হবে। “আমাদের দেশ একদিন নেশামুক্ত হবে” — এই বিশ্বাস নিয়েই প্রতিটি রবিবারের কর্মসূচি সফল করতে হবে। নইলে ২১ বছর পরেও আমরা একই প্রশ্ন করব। একটা সরকার যাবে, আবার একটা আসবে। ২১ বছরের এই লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেই যদি একাধিক রাজনৈতিক দল ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সরকারে আসে, তাহলে তো আরও ১০০ বছর অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। তাই সরকার তার দীর্ঘমেয়াদি এই কর্মসূচিকে স্বল্পমেয়াদি করুক, এই আশা আমরা করতেই পারি। ২০৩০-এর মধ্যেই চাই –” নেশামুক্ত যুব, বিকশিত ভারত!”