“মা, তুমি রাজার মতোই যাবে” — ব্যান্ডের সুরে, চোখের জলে মালদহের পিপলা গ্রামে পুত্রদের কৃতজ্ঞতার শেষ নিবেদন
মালদহ, হরিশ্চন্দ্রপুর, ২৪ জুলাই, muthokotha.in : বিদায় মানেই কি শুধু নীরবতা? বিদায় মানেই কি কেবলই শোক আর চোখের জল? বিদায়ের রং কি কান্না আর শ্মশানের ধোঁয়ায় বেদনাশ্রুর ডুকরে ওঠা ঢেউ ? মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুর থানার পিপলা গ্রাম শুক্রবার সকালে দেখল অন্যরকম এক বিদায়। ৯৫ বছরের দৈবকি দাস যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, তাঁর পাঁচ ছেলে ঠিক করলেন — “মা আমাদের রাজার মতো বাঁচিয়েছেন, রাজার মতোই বিদায় নেবেন।”
বার্ধক্যজনিত কারণে প্রয়াত মাকে তাই সাধারণ শোকযাত্রার বদলে ব্যান্ডের সুরে, বাজনার তালে তালে শেষ শ্মশানে পৌঁছে দিলেন তাঁরা। আর সেই সুরে ভিজে গেল গোটা গ্রাম।
শুক্রবার ভোর। পিপলা গ্রামের বাড়ির উঠোনে সাদা কাপড়ে ঢাকা দৈবকি দেবীর দেহ। চারপাশে ভিড়। কিন্তু কান্নার রোলের বদলে কানে এল ব্যান্ডের প্রথম সুর।
দৈবকি দেবীর পাঁচ পুত্র মিলে ঠিক করেছিলেন, মা সারাজীবন তাঁদের হাসি মুখে বড় করেছেন, কষ্ট বুঝতে দেননি। তাই শেষ যাত্রাটাও হবে উৎসবের মতো, সেটাই হবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। দাস পরিবারের বাড়ি থেকে শ্মশান পর্যন্ত প্রায় আধ কিলোমিটার পথ — ব্যান্ড পার্টি আগে আগে, তার পিছনে ফুলে ঢাকা খাটিয়া, আর খাটিয়ার চারপাশে পাঁচ ছেলে। গ্রামের বয়স্ক মানুষরা বলছেন, এমন দৃশ্য পিপলায় আগে কেউ কখনো দেখেনি। প্রতিটি মানুষের মনে এক অভাবনীয়, অবর্ণনীয় আবেশ তৈরি হয়েছিল। বাজনার প্রতিটি সুর যেন বলছিল — “মা, আমরা তোমাকে ভুলব না।”
ব্যান্ড আর শোভাযাত্রাতেই শেষ হয়ে যায়নি ছেলেদের ভাবনা। শেষযাত্রায় পা মেলানো প্রতিটি মানুষের জন্য ছিল তাঁদের আন্তরিক আয়োজন। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, শ্মশানযাত্রী — সবার জন্য বিশেষ খাবারেরও ব্যবস্থা করেছিলেন পাঁচ ভাই।
প্রশ্ন, কেন? উত্তর দিলেন মেজ ছেলে সুকুমার দাস। ধরা ধরা গলায় বললেন, “ আমাদের বাবা চলে গেছেন ৩০ বছর আগে। তারপর থেকে মা-ই ছিলেন আমাদের বাবা-মা দুটোই। আমরা পাঁচ ভাই মিলে পালা করে মায়ের ওষুধ, খাওয়া, সব দেখাশুনা করতাম। মা কোনোদিন বলেননি ‘আমাকে কষ্ট দিচ্ছিস’। আজ আমরা চলে যাওয়ার দিনে যদি ২০০ জনকেও পেট ভরে খাওয়াতে পারি, সেটাই মায়ের আশীর্বাদ।”
সুকুমার দাসের চোখ ছলছল। তিনি বললেন, “আজকাল খবরে দেখি, বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেলেরা বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসছে। আমরা চাই, এই ছবিটা সমাজের কাছে পৌঁছক। মা-বাবা থাকতে থাকতে তাঁদের জড়িয়ে ধরুন। পরে আফসোস করে লাভ নেই। আমাদের এই আয়োজন সেই বার্তাটাই দেওয়ার জন্য।”
কথা বলতে বলতে থেমে গেলেন সুকুমার। পাশে দাঁড়ানো ছোট ভাই চোখ মুছলেন। ৯৫ বছরের দৈবকি দেবী পাঁচ ছেলেকে মানুষ করেছেন একা হাতে। অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না। সেই ঋণ শোধ করার জন্যই বোধহয় শেষ দিনে এত আয়োজন।
শোভাযাত্রা দেখতে রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন গ্রামের মানুষ। কেউ মোবাইলে ভিডিও করছিলেন, কেউ চোখ মুছিলেন।
গ্রামের বাসিন্দা মনোজ দাস বললেন, “আমাদের পাড়ায় এখন একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। ছেলেরা বাইরে চাকরি করে, বাবা-মা একা পড়ে থাকেন। এই সময়ে দাঁড়িয়ে পাঁচ ভাই মিলে মাকে এভাবে সম্মান দেওয়া… এটা শুধু আবেগ নয়, এটা শিক্ষা। পরের প্রজন্মের জন্য উদাহরণ।”
শ্মশানে চিতায় আগুন দেওয়ার আগে শেষবারের মতো ব্যাণ্ডে বাজল ‘জননী’ সুর। উপস্থিত অনেকেই তখন আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
স্থানীয়রা বলছেন, টাকা-পয়সা দিয়ে মায়ের ঋণ শোধ হয় না। কিন্তু শ্রদ্ধা, যত্ন আর সম্মান দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানানো যায়। দৈবকি দাসের পাঁচ ছেলে সেটাই করে দেখালেন।
যখন খবরের কাগজে রোজ বৃদ্ধাশ্রম, সম্পত্তির জন্য মামলা, অবহেলার খবর আসে — তখন পিপলা গ্রামের এই ছবিটা বুকের ভেতর একটা আলো জ্বেলে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বড় হল মায়া। আর সেই মায়া যদি পাঁচ ভাই একসাথে ধরে রাখতে পারে, তাহলে সমাজটাও বদলানো সম্ভব।
বিদায়ের পর থেমে গেল ব্যাণ্ড। কিন্তু গ্রামের মানুষের মনে বেজে গেল একটাই কথা — “মা বেঁচে থাকতে তাঁকে রাজার মতো রাখো। কারণ তিনি তো সারাজীবন আমাদের রাজপুত্র-রাজকন্যা করেই বড় করেছেন।”
চলে গেলেন দৈবকি দাস । পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেলেন তিনি। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম-এর মায়ের শরীর মিশে গেলেও ছেলেদের চোখের সামনে মা যে চিরদিনই অমর। তাই পাঁচ ছেলের দেওয়া এই ‘রাজকীয় বিদায়’ পিপলা গ্রামের মানুষের মনে থেকে যাবে বহুদিন।