পর্দার আড়ালে ব্যাক্তিগত জীবনের গল্প থাকে লুকিয়ে: আলোয় মোড়া এক ট্র্যাজেডির নাম মধুবালা
অলকেশ মাইতি,২১ জুলাই, muthokotha.in: আলোর বিপরীতে যে অন্ধকার থাকে সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আলোর জ্যোতি যাঁরা খুঁজে বেরিয়েছেন, তাঁরা এই জগতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে। টলিউড বলিউড হলিউডের ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমন অনেক চরিত্রের দেখা মেলে। বলিউডের ইতিহাসেও এমন কিছু নাম আছে যে নামের সাথে শুধু অভিনেত্রী নয়, এক একটা যুগের ছায়া ধরা পড়ে। মধুবালা ঠিক তেমনই এক নাম। বোধহয় , “সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি”, “ভেনাস অফ ইন্ডিয়ান সিনেমা” ইত্যাদি বিশেষণগুলো তাঁর জন্যই তৈরি হয়েছিল। মাত্র ৩৬ বছরের ছোট্ট জীবনে তিনি যা খ্যাতি পেয়েছেন, তা অনেকের সারাজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু সেই আলোর পেছনেই ছিল দীর্ঘ অন্ধকার, যন্ত্রণা আর নিঃসঙ্গতা।
বলিউডের “স্বপ্নসুন্দরী” মধুবালার আসল নাম ছিল মুমতাজ জাহান বেগম দেহলভি । ১৯৩৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি, দিল্লিতে এক দরিদ্র পাঠান পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আতাউল্লাহ খান ছিলেন ফিল্ম স্টুডিওর একজন সাধারণ কর্মী। ৯ ভাই-বোনের সংসার চালাতে গিয়ে ৯ বছর বয়সী ছোট্ট মুমতাজকেই ক্যামেরার সামনে নামতে বাধ্য করেন বাবা আতাউল্লাহ ।
মাত্র ৯ বছর বয়সে “বসন্ত” (১৯৪২) ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ। সেই সময় পরিচালক কেদার শর্মা তাঁর নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করলেন –“মধুবালা” । এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
১৯৪০-এর দশকের শেষে “নীল কমল” এবং “লাল দুপাট্টা” ছবিতে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেন এবং সুনাম অর্জন করেন। এরপর একে একে সুপারহিট ছবিতে তাঁর ডাক পড়ে । ১৯৪৯ সালে “মহল” ছবির “আয়েগা আনেওয়ালা” গান তাঁকে রাতারাতি সুপারস্টার বানিয়ে দেয়। সেই ছায়া-ছবির ভূতুড়ে সৌন্দর্য, আর তাঁর মোহময় মায়াভরা চোখের ভাষায় মুগ্ধ চলচ্চিত্রপ্রেমী আপামর ভারতবাসী। সেই প্রথম ভারতীয় সিনেমা সৌন্দর্যের লীলায় ডুব দিয়ে নিজেকে ধন্য করে তুললো।
১৯৫০-এর দশক ছিল মধুবালার চলচ্চিত্র জীবনের স্বর্ণযুগ। “তারানা”, “মি. অ্যান্ড মিসেস ৫৫”, “চলতি কা নাম গাড়ি”, “কালা পানি”, “হাওড়া ব্রিজ”- একের পর এক সিনেমা সুপার হিটের তালিকায় উঠে আসে। মধুবালার অভিনয় ও কমিক টাইমিং, নাচ, আর অবশ্যই গ্ল্যামার তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
মধুবালাই ছিলেন ভারতের প্রথম নায়িকা যাঁর ছবি ১৯৫২ সালে মার্কিন ম্যাগাজিন “Theatre Arts”-এর কভারে ছাপা হয়েছিল। হলিউড পরিচালক ফ্র্যাঙ্ক ক্যাপ্রা তাঁকে “The Indiscretion of an American Wife” ছবির জন্য অফারও দিয়েছিলেন। কিন্তু নায়িকার বাবা তাঁকে বিদেশে গিয়ে শ্যুটিং করতে দেননি।
তাঁর সৌন্দর্য নিয়ে গোটা দেশ পাগল ছিল। পরিচালকরা বলতেন, “ক্যামেরা তো মধুবালাকে ভালবাসে”। তাঁর হাসি, তাঁর চোখের কোণের টোল – এগুলোই ছিল মধুবালার ব্র্যান্ড।
দিলীপ-মধুবালা,এক অসম্পূর্ণ কাব্য
মধুবালার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় তাঁর প্রেম। এক্ষেত্রে অবশ্যই যাঁর নাম বিপরীতে উঠে আসে, তিনি হলেন — দিলীপ কুমার। দিলীপ কুমারের সঙ্গে আলাপ হয় “তারানা” ছবির সেটে। তারপর থেকেই নতুন অধ্যায় শুরু হলো, যা নিতান্তই তাঁর ব্যক্তিগত প্রেম। এই প্রেমই ১৯৫০-এর দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি হিসেবে দাঁড় করায় দিলীপ-মধুবালাকে। তাঁরা একসাথে “সাঙ্গদিল”, “ইন্সাফ”-এর মতো জনপ্রিয় ছবি করেন।
তবে এই প্রেম পরিণতি পায়নি। ১৯৫৭ সালে “নয়া দৌর” ছবির শ্যুটিং নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়। দিলীপ কুমার চেয়েছিলেন মধুবালা আদালতে এসে সাক্ষ্য দিক , কিন্তু মধুবালার বাবা তাতে অনুমতি দেননি। এই নিয়েই দুজনের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল দেখা দেয়। আদালতের বাইরে তাঁদের দেখা, কথাবার্তা , সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। দিলীপ কুমার সরে এলেন মধুর জীবন থেকে। পরে তিনি সায়রা বানুকে বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করলেন।
দিলীপকুমারের বিয়ের পর মধুবালা ভেঙে পড়েছিলেন। এই সংকট মুহূর্তে ঘনিষ্ঠরা বলেন, এই বিচ্ছেদ মধুকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়। প্রেমে আঘাত পাওয়া মেয়েটা এরপর আরও বেশি করে কাজের মধ্যে ডুবে গেলেন, শরীরের দিকে আর নজর দিলেন না। ধীরে ধীরে
শরীরে বাসা বাঁধলো রোগ।
সমস্তকিছুর আড়ালে মধুবালা লড়ছিলেন এক নীরব ঘাতকের সাথে, যা ছিল তাঁর কিংবা তাঁর পরিবারের সবার কাছেই অজানা। তাঁর জন্মগতভাবে হৃদপিণ্ডে একটি ছিদ্র ছিল – Ventricular Septal Defect। এই সময় ডাক্তাররা বলেছিলেন— বিশ্রাম না নিলে তিনি ২ বছরও বাঁচবেন না। মধুবালা ডাক্তারদের কথায় কান দিলেন না।
১৯৫৪ সালে “বহুত দিন হুয়ে” ছবির শ্যুটিং চলার সময় প্রথমবার তিনি রক্তবমি করেছিলেন। সেটেই ধরা পড়েছিল অসুস্থতা। কিন্তু পেটের দায় আর বাবার চাপে তিনি কাজ ছাড়তে পারেননি। এইভাবে অসুস্থ শরীর নিয়ে একের পর এক ছবি সাইন করেছেন।
অবশেষে বিয়ের পিঁড়িতে মধুবালা ও কিশোর কুমার:–
১৯৬০ সালে তিনি বিয়ে করলেন প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ও কৌতুক অভিনেতা কিশোর কুমারকে। কিশোর তাঁর জন্য সবকিছু ছেড়েছিলেন, অথচ বিয়ের পরপরই মধুবালার শরীর ভাঙতে শুরু করে। অক্সিজেনের অভাবে তাঁর আঙুল নীল হয়ে যেতে লাগলো। ডাক্তাররা আমেরিকা নিয়ে গিয়ে অপারেশনের পরামর্শ দিলেন, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
শেষের সেই দিনগুলো ছিল খুবই অসহায়, খুবই মর্মস্পর্শী।
অসুস্থতা তাঁকে এবার সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলল। যে মেয়েটা একসময় আয়নার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাত, সে এবার নিজের চেহারা দেখা বন্ধ করে দিল। ওজন কমে ৩০ কেজির নিচে নেমে গেল। শরীরের হাড় বেরিয়ে এলো। সেই সময়টা তিনি নিজেকে দেখে খুব ভয় পেতেন।
স্বামী কিশোর কুমার শেষের দিকে স্ত্রী মধুবালাকে আর সময় দিতে পারলেন না। সেই সময়টা ছিল মরণের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ জীবনের শূন্যতায় ভরা নিজের দিকে তাকিয়ে থাকা নিজের জন্য একটি ভাবলেশহীন আর্তমুহূর্ত! শয্যাশায়ী মধুবালার দেখাশোনা করতেন তাঁর বোনেরা।
১৯৬৯ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের বান্দ্রার বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নায়িকা মধুবালা। শেষ ইচ্ছে মতো দিল্লিতে তাঁকে তাঁর বাবার পাশেই কবর দেওয়া হলো।
মধুবালা মারা গেছেন, কিন্তু মধুবালা শেষ হয়ে যাননি। বিশ্ববন্দিত “মুঘল-এ-আজম”-এর মুমতাজ আজও ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে আইকনিক চরিত্র। “পেয়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া” গাইলে আজও চোখে ভাসে তাঁর সেই চোখ , তাঁর সেই মুখ।
তাঁর মধ্যে ছিল একটা দুঃখী, ভঙ্গুর , নিঃসঙ্গ মেয়ের গল্প। যে মেয়েটি হাসতে হাসতে দর্শককে আনন্দ দিয়েছে, অথচ নিজে হাসতে পারেনি। বাতির জ্বলতে জ্বলতে একদিন নিস্তেজ হয়ে ছাই হয়ে যাওয়ার মতো তাঁর নিভে যাওয়া।