রহস্যের কুয়াশায় মোড়া চণ্ডীপুরের কনটেন্ট ক্রিয়েটর সীমা দাসের আকস্মিক বিয়োগ : শোকস্তব্ধ এলাকা
৯ আগস্ট, চণ্ডীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, muthokotha.in: সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দায় যিনি ক’দিন আগেও গানের তালে নেচে হাজারো মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছিলেন, যিনি শনিবারও তাঁর হাসি মুখ দিয়ে দর্শকদের মন জিতেছেন, তিনিই আজ পরাজিত, তিনিই আজ নিথর। চণ্ডীপুরের পায়রাচালী গ্রামের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সীমা দাসের আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে গোটা এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক ও ধোঁয়াশা। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সোশ্যাল মিডিয়ার আলো থেকে অন্ধকারে চলে যাওয়া এই ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না পরিবার, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে তাঁর প্রায় ৪ লক্ষ অনুগামী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার রাতে নিজের বাড়িতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন সীমা। এরপরই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর খবর সকালে ছড়িয়ে পড়তেই পায়রাচালী গ্রামে শোকের ছায়া। প্রতিবেশীরা ভিড় জমান তাঁর বাড়ির সামনে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয় “RIP Seema Di” পোস্ট।
শনিবারও তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে আপলোড হয়েছিল নতুন একটি রিল ভিডিও। সেই ভিডিওর কমেন্ট বক্সেই এখন ভরে উঠছে শ্রদ্ধা ও অবিশ্বাসের মন্তব্য।
চণ্ডীপুর ব্লকের পায়রাচালী গ্রামের বাসিন্দা সীমা দাস পেশায় ছিলেন একজন হেয়ার আর্টিস্ট। বাড়িতেই ছোট করে চুলের কাজ করতেন তিনি। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় ছিল কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে। পায়রাচালীর মেয়ে সোস্যাল মিডিয়ার নায়িকা সীমার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ নেটিজেন থেকে আপনজন।
ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ট্রেন্ডিং গানের সঙ্গে লিপসিঙ্ক ও নাচের ভিডিও পোস্ট করতেন নিয়মিত। গ্রামের সাধারণ মেয়ে হয়ে কীভাবে অল্পদিনে ৩ লক্ষ ৯৫ হাজার ফলোয়ার জুটিয়ে ফেলেছিলেন, তা নিয়ে এলাকার মানুষের গর্ব ছিল। তাঁর সরলতা, হাসি আর মাটির গন্ধ মাখা ভিডিওগুলি দ্রুত মানুষের মন জয় করে নেয়।
নিলাদ্রী দাস বলেন, “দিদি আমাদের গ্রামের গর্ব ছিল। ফোনে ভিডিও করে আপলোড করত। বলত, ‘আমার মতো সাধারণ মেয়েরাও পারে’। আজ ওঁর এই খবরটা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না।”
সীমার মৃত্যুকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন — কীভাবে হল এই আকস্মিক মৃত্যু? অসুস্থতা নাকি আত্মহত্যা? ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে সবটাই পরিস্কার হবে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, বাড়িতে চুলের কাজে ব্যবহৃত হেয়ার ডাই বা রং জাতীয় পদার্থ খেয়ে ফেলার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে। কিন্তু এটি ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়া, নাকি অসাবধানতাবশত ঘটেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কিছু জানানো হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে মুখ খোলা হয়নি। তবে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট ও তদন্তের পরই মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে। আত্মহত্যা নাকি অন্য কিছু, এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।
এই অস্পষ্টতার কারণেই এলাকায় জল্পনা আরও বাড়ছে। কেউ বলছেন মানসিক অবসাদ, কেউ বলছেন কাজের চাপ। তবে পুলিশ আপাতত সব দিক খতিয়ে দেখছে।
সীমা দাসের ফেসবুক প্রোফাইল এখন কার্যত শোকবার্তার দেওয়াল। তাঁর শেষ পোস্টের নিচে হাজার হাজার কমেন্ট। — “দিদি, এটা কী করলে?”, “তোমার ভিডিও আর কে বানাবে?”, “খুব তাড়াতাড়ি চলে গেলে” — এমন হাজারো মন্তব্যে ভরে গিয়েছে।
ইনস্টাগ্রামেও তাঁর ফ্যানপেজগুলি থেকে কালো প্রোফাইল পিকচার দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। অনেকেই লিখছেন, “সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ, নেগেটিভ কমেন্ট — এগুলো কি কোনও ভূমিকা রেখেছে?” যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনও প্রমাণ মেলেনি।
সীমার মৃত্যু ফের একবার প্রশ্ন তুলে দিল — সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তার পেছনের চাপটা কতটা। একজন গ্রামের মেয়ে, বাড়ির কাজ সামলে, কনটেন্ট বানিয়ে, ভিউ-লাইকের টেনশন নিয়ে প্রতিদিন নিজেকে মেলে ধরা — এটা সহজ নয়। মনোবিদদের মতে, অনলাইন জনপ্রিয়তার সঙ্গে আসে সমালোচনা, তুলনা এবং এক ধরনের মানসিক চাপ।
পায়রাচালীর আরেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক , তিনি বলেন, “আমরা সবাই সীমা দিদিকে চিনতাম। ও খুব পরিশ্রমী ছিল। কিন্তু কে কী ভাবছে, ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে কিনা — এই চিন্তা সবসময় থাকে। সরকার বা প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত ক্রিয়েটরদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া।”
সীমার বাড়িতে এখন কান্নার রোল। প্রতিবেশীরা বলছেন, খুব হাসিখুশি মেয়ে ছিল। সবার সঙ্গে মিশত। বাড়ির কাজের পাশাপাশি নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য ভিডিও বানাত। পরিবারের এক সদস্যরা কান্নাজড়িত গলায় বলেন, “কাল রাতেও কথা বলেছে। সকালে উঠে এই খবর। আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ তদন্ত করুক, আমরা সত্যিটা জানতে চাই।”
আপাতত সীমা দাসের মৃত্যুর কারণ নিয়ে চলছে জল্পনা। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। একটি গ্রামের মেয়ে, যে নিজের প্রতিভা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় জায়গা করে নিয়েছিল, তার এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছে না কেউই।
পায়রাচালীর আকাশে আজ মেঘ। সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনে আর নতুন ভিডিও আসবে না। রয়ে যাবে শুধু স্মৃতি, আর একরাশ প্রশ্ন — কেন, কীভাবে, কী কারণে?
প্রশাসন ও পুলিশের তদন্তের দিকে তাকিয়ে গোটা চণ্ডীপুর। সত্য উদঘাটন হলেই হয়তো কিছুটা হলেও শান্তি পাবে সীমার অনুগামীরা।