অলকেশ মাইতি, ৮ আগস্ট, muthokotha.in : “তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা!”
বাইশে শ্রাবণ। বাঙালির বুকের ভেতরটা আজও চিনচিন করে ওঠে। ১৯৪১ সালের এই দিনেই, বর্ষার জলে ধোয়া কলকাতায় নিভে গিয়েছিল বাংলার আলো। থেমে গিয়েছিল সেই কণ্ঠ, যে কণ্ঠে প্রথম “জনগণমন” বেজে উঠেছিল। আজও আকাশ জুড়ে শ্রাবণের মেঘ। আজও বৃষ্টির ধারা ধুয়ে যায় অন্ধকার।
তবুও তো শ্রাবণের মেঘে কবি মিশে আছেন বৃষ্টির মতো। কখনো প্রবল তো কখনো ঝিরঝিরে ধারা হয়ে ভিজিয়ে দেন আমাদের মন। শ্রাবণ মানেই রবীন্দ্রনাথ। এই শ্রাবণ ছিল তাঁর ভীষণ প্রিয় মাস। শান্তিনিকেতন ছাড়া, শহরের বুকে শ্রাবণকে কবি একেবারেই মানতে পারতেন না। ‘ বর্ষা মঙ্গল ‘ তাই শ্রাবণকে জড়িয়ে ধরেই অনুষ্ঠিত হতো। তাঁর গানে, কবিতায়, গল্পে শ্রাবণ বারবার ফিরে এসেছে। আর সেই শ্রাবণেই তিনি বিদায় নিলেন। যেন প্রকৃতিই তাঁকে নিজের কোলে টেনে নিল।
যেমন আজ সকাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের প্রাঙ্গণে যেমন ছুটে এসেছে বৃষ্টি, তেমনি সেদিনও বৃষ্টি কলকাতায় ছুটে এসেছিল কবির জন্য। ফুল হাতে, খালি পায়ে মানুষের ঢল নেমেছিল জোড়াসাঁকোর দিকে। কারও হাতে রজনীগন্ধা, কারও হাতে কবির প্রিয় জুঁই…… ইত্যাদি। কেউ গাইছে _”মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান”! কেউ গাইছে ” তুমি কি কেবলই ছবি!” কবির মৃত্যু সংবাদ সেদিন ঘরে ঘরে আপনজন হারানোর বেদনার সাথে সাথে, কবিকে যেন অন্যকোথাও বিশ্রাম নেওয়ার জন্য রেখে আসার বিচ্ছেদ যন্ত্রণার মাঝে ফিরে পাওয়ার বিরাট ব্যাকুলতা!
আজ জোড়াসাঁকো থেকে বিশ্বজুড়ে ২২ শ্রাবণ।
কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেও আজ অন্যরকম সকাল। কবির ব্যবহৃত তুলি, চেয়ার, লেখার টেবিল — সবকিছুতেই যেন আজও লেগে আছে তাঁর স্পর্শ। সেখানে পাঠ হচ্ছে _”নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ”_ থেকে “শেষ লেখা” পর্যন্ত।
শুধু বাংলা নয়। প্যারিস, লন্ডন, নিউইয়র্ক , অন্যান্য দেশেও কবির বিশ্রাম দিবসের স্মরণ চলছে। সহজ কথায় বলতে গেলে —– যেখানে বাঙালি আছে, সেখানেই আজ রবীন্দ্রসন্ধ্যা। স্কুলের বাচ্চারা নাচছে “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে”। আবৃত্তিকাররা পড়ছেন “দুই বিঘা জমি”।
আজ ৮০ বছর কবি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।এই ৮০ বছর পেরিয়েও রবীন্দ্রনাথ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক!
যখন যুদ্ধ হয়, তিনি বলেন “সভ্যতার সংকট”।
যখন প্রকৃতি ধ্বংস হয়, তিনি মনে করান “বৃক্ষরোপণ”।
যখন মানুষ বিভেদ ভোলে, তিনি গেয়ে ওঠেন “বিশ্বমানব”-এর গান।
তাই আজকের দিনে শোকের পাশাপাশি যেমন গর্ব আছে, তেমনি চেতনাকে উস্কে দেওয়ার শিখাও আছে। সেই শিখাই হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন মানুষ কীভাবে একটি জাতির ভাষা, সঙ্গীত, শিক্ষা, চেতনা , সংস্কৃতি — সবকিছুকেই একা হাতে বদলে দিতে পারেন, রবীন্দ্রনাথ হলেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে প্রতিদিন। শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে প্রদীপ জ্বলে। জোড়াসাঁকোও বাদ যায় না। সেই সান্ধ্য মুহূর্তে কেউ যেন ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে—- “শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে?”
না, শেষ হয়নি। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন আকাশে মেঘ করবে, যতদিন মানুষ প্রেমে পড়বে — ততদিন রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকবেন সবার হৃদয়ে, ততদিন মানুষ গাইতে থাকবে — ” তুমি কেমন করে গান করো হে গুণি!”