৬ আগস্ট, muthokotha.in: তখন মাঝরাত। হাঁ করে ঘরের দরজা খুলে গেল। গায়ে পোশাক নেই। হাতে রয়েছে দুই যমজ কন্যাসন্তান। ভেসে আসছে বাচ্চাদের কান্না। দেশে সবাই যখন শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন , তখন এক “অপদার্থ বীরপুরুষ” স্বামী তার স্ত্রীকে মারতে মারতে রাস্তায় ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, পরনের পোশাক পর্যন্ত খুলে নিয়েছিলেন। কু ছিল তাঁর অপরাধ? তিনি খোঁড়া, আর তাঁর ঘরে জন্মেছে দুই মেয়ে।
সেই রাতের অসহায় নারীটিই আজ ভারতের গর্ব। নাম শর্মিলা ধনকড়। ২০২৬ সালের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের মঞ্চে প্যারা অ্যাথলেটিক্সে শটপুটে সোনা জিতে দেশের পতাকা উঁচু করলেন তিনি। সিজন বেস্ট ৯.৫১ মিটার থ্রো। F57 ক্যাটেগরিতে বসে ৪ কেজির লোহার বল ছুঁড়ে তিনি শুধু দূরত্ব জেতেননি, জিতেছেন একটা গোটা সমাজের মানসিকতা।
শর্মিলার জন্ম এক অভাবী প্রান্তিক পরিবারে। শৈশবেই পোলিওর আক্রমণে একটি পা চিরতরে বিকল হয়ে যায়। সমাজের চোখে তিনি “অপয়া”, “বোঝা”। পড়াশোনা, খেলাধুলা — এসব তার জন্য নয়। কিন্তু শর্মিলা মানতে রাজি ছিলেন না।
বিয়ের পর অবস্থা আরও খারাপ হয়। স্বামীর চোখে তার খোঁড়া পা আর দুই কন্যাসন্তান ছিল অভিশাপ। রোজকার অত্যাচার, গালিগালাজ, মারধর। সেই পুরুষটি ভেবেছিল অসহায় মেয়েমানুষটি পড়ে পড়ে মার খাবে। কিন্তু শর্মিলা ধনকড় মার খাওয়ার জন্য জন্মাননি। তিনি জন্মেছেন সপাটে থাপ্পড় মারার জন্য।
যেদিন রাতে দুই মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘর ছাড়লেন, সেদিনই তিনি ঠিক করে নিয়েছিলেন — এবার নিজের জীবনের রাশ নিজের হাতে তুলে নেবেন।
রাস্তায় নেমে আসার পর জীবনটা সহজ ছিল না। দুই কোলের শিশু, নিজের একটা পা অচল। কিন্তু শর্মিলা থেমে থাকেননি। প্রথমে পরিচারিকার কাজ, তারপর ছোটখাটো কাজ। দুই মেয়েকে মানুষ করার পাশাপাশি নিজের জন্য একটা পরিচয় খুঁজছিলেন তিনি।
সেখান থেকেই প্যারা স্পোর্টসের সঙ্গে পরিচয়। প্রথমে হুইলচেয়ার ঠেলে মাঠে যেতেন। কোচরা বলেছিলেন, “তোর হাতে জোর আছে। শটপুট ছোঁড়।” শর্মিলা হাসতেন। যে হাতে সংসারের ভার, সেই হাতেই লোহার বল?
কিন্তু তিনিই পারলেন। রোজ সকালে মেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে, নিজে ট্রেনিং নিতেন। দুপুরে কাজ, রাতে আবার অনুশীলন। পাহাড় প্রমাণ অভাব, সমাজের কটূক্তি — সব ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। কারণ তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, কন্যাসন্তান বোঝা নয়। কন্যা মানে শক্তি। তার দুই মেয়েই তার প্রেরণা। জীবনের লড়াইটা তখন একটি স্টেডিয়াম আর দুইটি মেয়েকে নিয়ে।
অবশেষে এলো সেই দিন। ২০২৬ গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস। F57 ক্যাটেগরি — অর্থাৎ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্য বসে প্রতিযোগিতা। গ্যালারিতে ভারতের পতাকা। শর্মিলা হুইলচেয়ারে বসে আছেন। সামনে ৪ কেজির শটপুট।
প্রথম থ্রো: ৮.৯০ মিটার।
দ্বিতীয় থ্রো: ৯.২০ মিটার।
তৃতীয় থ্রো: ৯.৫১ মিটার — সিজন বেস্ট।
গোটা স্টেডিয়াম স্তব্ধ। তারপর হাততালি। সেই থ্রো-টা শুধু ৯.৫১ মিটার যায়নি। সেটা গিয়ে লেগেছিল সেই “অপদার্থ মানুষটার” ঘরের জানালার কাঁচে। যে বলেছিল মেয়েরা বোঝা, যে বলেছিল খোঁড়া বউ দিয়ে কিছু হবে না — তার মুখের উপর সপাটে জবাব।
সোনার পদক গলায় ঝুলিয়ে শর্মিলা কেঁদেছিলেন। কিন্তু সেটা কষ্টের কান্না নয়। সেটা ছিল জয়ের কান্না। দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, “দেখ, মা পেরেছে।”
যে সমাজে কন্যাসন্তান জন্মালে মুখ কালো হয়, সেই সমাজকে শর্মিলা দেখিয়ে দিলেন মেয়েরাই পারে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে। পোলিও আক্রান্ত একটি পা তাকে থামাতে পারেনি। বরং বসেই সে প্রমাণ করেছে শরীর নয়, মনই আসল শক্তি। মাঝরাতে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল যাঁকে, সে-ই আজ জগত জুড়ে চর্চার আলোয়। জাতীয় সঙ্গীতের সময় সবার চোখ বেয়ে অজান্তেই জল নেমে এলো।
শর্মিলার গল্প অনুপ্রেরণার। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি ধাক্কাও। একজন প্রতিভাবান অ্যাথলিটকে কেন রাস্তায় নামতে হল? কেন তাঁর জন্য সরকারি সাহায্য, প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন আগে থেকে ছিল না? প্যারা অ্যাথলিটদের জন্য পরিকাঠামো, স্পনসরশিপ, মানসিক স্বাস্থ্যের কাউন্সেলিং — এগুলো এখনও অনেক পিছিয়ে।
শর্মিলা একা লড়ে জিতে গেছেন। কিন্তু হাজার হাজার শর্মিলা এখনও অত্যাচার সহ্য করে ঘরের কোণে পড়ে আছে। তাদের হাতেও তো ৪ কেজির বল থাকতে পারে। শুধু সুযোগটা দিতে হবে। শর্মিলা ধনকড়ের জীবন একটি পাঠ্যপুস্তক।
তিনি শেখালেন — কীভাবে অত্যাচারী স্বামীকে ছেড়ে বেরিয়ে আসার পরও নিজেকে জীবনযুদ্ধে জয়ী করা যায়! তিনি শেখালেন —প্রতিবন্ধকতা অজুহাত নয়, অস্ত্র। তিনি শিখিয়েছেন— মেয়ে জন্ম দেওয়া “পাপ” নয়, গর্ব।
আজ তাঁর দুই মেয়ে স্কুলে গিয়ে গর্ব করে বলে, “আমার মা কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়ন।” এর থেকে বড় জবাব আর কী হতে পারে?
শর্মিলার ছোঁড়া ৯.৫১ মিটারের বলটা শুধু মাঠের বাইরে যায়নি। সেটা গিয়ে আঘাত করেছে আমাদের কুসংস্কার, পুরুষতন্ত্র ও অক্ষমতার মানসিকতায়।
তিনি প্রমাণ করেছেন, জীবন তোমাকে রাস্তায় ছুঁড়ে দিলেও তুমি উঠে দাঁড়াতে পারো। দুই কোলে দুই সন্তান নিয়েও তুমি দেশের জন্য সোনা আনতে পারো।
গ্লাসগোর মঞ্চে যখন জাতীয় সঙ্গীত বাজছিল, তখন গোটা ভারত বুঝেছিল — শক্তি পেশিতে নয়, ইচ্ছাশক্তিতে। আর সেই ইচ্ছাশক্তির নাম শর্মিলা ধনকড়।
সেই রাতের অসহায় নারী আজ কোটি কোটি মেয়ের রোল মডেল। কারণ তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, থাপ্পড় খাওয়ার জন্য নয়, থাপ্পড় মারার জন্যই মেয়েরা জন্মায়। আর প্রয়োজনে সেই থাপ্পড়টা ৯.৫১ মিটার দূরে গিয়েও লাগে।