৪ আগস্ট, অলকেশ মাইতি, muthokotha.in: সাহিত্য কখনোই শুধুমাত্র শব্দের আঁকিবুঁকি নয়। সাহিত্য সমাজের আয়না। যে আয়নায় চোখ রাখলে সমাজ নিজেকে বুঝতে পারে, ভালোমন্দের বিচার করতে পারে । যখন রাষ্ট্র, প্রশাসন বা জনজীবনে বড় কোনো ঘটনা ঘটে, যে ঘটনায় বিপর্যস্ত হয় আমাদের যাপনচিত্র — তখন কবি-সাহিত্যিকদের কলম এবং কণ্ঠকে মানুষ খোঁজে, সেই কলম বা কণ্ঠ মুক্তির পথ দেখায়। পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি কবি জয় গোস্বামীকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে, যে প্রশ্নটা শুধু জয় গোস্বামীকে নিয়ে নয়, বহু বিশিষ্ট মানুষকে নিয়ে। প্রশ্নটি ঠিক এমনই — কবির দায়িত্ব কতটা? আর কবিকে অপমানিত হতে হলে দায়টা কার?
বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের রাজত্বে অনেক ভালোমন্দ প্রত্যক্ষ করেছেন মানুষ। নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, নেতাই সহ বহু ঘটনার প্রেক্ষিতে সমাজের বিশিষ্টজনেরা রাস্তায় নেমেছেন, কলম ধরেছেন, মানুষের মধ্যে প্রতিবাদের মানসিকতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, এমনকি সরকার বদলের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। অথচ ২০২৪-এর আরজিকর হাসপাতাল-কাণ্ড, সমাজের মেরুদন্ডরূপী শিক্ষকদের চাকরি বিক্রি – চাকরিহারা শিক্ষকদের উপর পুলিশি লাঠিচার্জ, রাহাজানি, গণহত্যা সহ একাধিক ঘটনায় সংঘটিত জনবিক্ষোভের সময় এই জয় গোস্বামীর মতো কবি সাহিত্যিকদের প্রকাশ্যে কোনো প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি, অথচ সেই সময়েই তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় উপস্থিত থেকে তাঁর পাশে সারাজীবন থাকবার আশ্বাস পর্যন্ত দিয়েছিলেন, এমনকি কোলাঘাটের একটি স্কুলের শতবর্ষপূর্তির মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই কবিই ঘোষণা করেছিলেন, “আজন্মের মতো লেখালিখি ছেড়ে দিলাম”। তাঁর সেই ঘোষণায় স্তম্ভিত হয়েছিল পাঠকমহল। একজন কবি যখন নিজেকে গুটিয়ে নেন, নিজের কলমকে চাটুকারিতায় পরিণত করেন , নিজেকে শাসকের ছায়া মনে করেন — তখন পাঠক সমাজ ভীষণ অসহায় বোধ করে। সাধারণ মানুষ নিজেদের বলিষ্ঠ অভিভাবক, দীপ্ত কণ্ঠস্বর, চেতনার সলতেকে নিস্তেজ হতে দেখে অভিমান ও আশ্চর্যবোধ করে।
তারপর সরকার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত মানুষই নেন। তৃণমূলের নৈরাজ্যের উৎখাত ঘটিয়ে নূতন সরকার গঠন করে সাধারণ মানুষ। বাঙলার বুদ্ধিজীবীদের একটা বড়ো অংশকে এই পরিবর্তনের পেছনে তেমন অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি। তাই মানুষ এই চাটুকারদের সুযোগ পেলেই যোগ্য জবাব দিতে মুখিয়ে ছিলেন। এরপর শনিবার রবীন্দ্রসদনের একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে সেই জয় গোস্বামীকে আবার মঞ্চে দেখা গেলে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হওয়াটাই স্বাভাবিক। সেখানে আবার তিনি বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে একটি কবিতাও পাঠ করেন।
মানুষ তো জয় কবির সাম্প্রতিক অতিতের কাজকর্মকে ভুলে যাননি, তাঁর তোষামোদের দিনগুলোকে মাথায় রেখে, এদিনের ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন — যে কবি একসময় “লেখা ছাড়ার” কথা বলেছিলেন, যে প্রকাশ্যে তৃণমূল সরকারের অন্যায় দেখেও সেই সরকারের পাশে সারাজীবন থাকবার কথা বলেছিলেন, তিনি কেন আবার এইধরনের মঞ্চে ফিরে এলেন ? বিশেষ করে যিনি আর লেখার জগতে ফিরবেন না বলে ঘোষণা করেছিলেন— আর ফিরলেনই যখন, তবে কেন এমন বিষয় বেছে নিলেন যা আরও বিতর্ক ডেকে আনবে?
আসলে অভিযোগের মূল সুর হল, কবি জয় গোস্বামী নাকি সরকারের সমালোচনা এড়িয়ে চলেন, শুধু তাই নয় সরকারের জনবিরোধী কাজের সময়ও সরকারের পাশেই তিনি থাকেন। আরজিকর থেকে শিক্ষক পেটানো — কোথাও তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ শোনা যায়নি। ফলে একাংশের ধারণা, তিনি “সুবিধালোভি”। আবার যখন তিনি তসলিমাকে নিয়ে লেখেন, তখন আরেক অংশ বলেন এটা “চাটুকারিতা”। এই “সুবিধাভোগী” ও “চাটুকারিতা” তকমাটা তাঁর সরকার এবং সরকারপন্থী দলের প্রতি আনুগত্যের ফলস্বরূপই প্রাপ্ত।
তবে সাহিত্যের ইতিহাস বলছে, কবি সবসময় রাজনৈতিক বিবৃতি দিতে বাধ্য নন। রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ — সবার কলমের ধরন কিন্তু আলাদা।
নজরুল ইসলাম , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুকুন্দ দাস, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য , রজনীকান্ত সেন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কামিনী রায় প্রমুখ কবি নিজস্ব ঘরানায় কলম ধরেছেন। কেউ কৌশলে তো কেউ সরাসরি , কেউ আবার রূপকের আড়ালে লেখনির মাধ্যমে তৎকালীন শাসকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।
তবে কবি যে অপমানিত হয়েছেন, এ বিষয়ে কারুরই দ্বিমত নেই। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই অপমানের দায়ভার কার? তাঁকে যাঁরা রবীন্দ্রসদনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাঁরাও কী বাদ যাবেন এই মুহূর্ত তৈরির কারণ থেকে? কবির অপমানের দায় আয়োজকদেরও নিতে হবে, যাঁরা তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাঁদের ভাবার দরকার ছিল কবির সাম্প্রতিক অতীতের কাজকর্মের কথা। আজ কবি তাঁর কথা বলতে গিয়ে, কবিতা পড়তে গিয়ে, যে সম্মান হারিয়েছেন তা শুধু তাঁর অপমান নয় , বাংলা সাহিত্যের ওপরও একটি আঘাত। অবশ্য কবি নিজেও জানতেন তিনি নিরপেক্ষ ছিলেন না। তাই বোধহয় তাঁকে বলতে শোনা যায় —” আমাকে যাঁরা অপমান করেছেন, তাঁরা ঠিক কাজই করেছেন।”
পাঠকই কবিকে বাঁচিয়ে রাখে। পাঠক চায় কবি সংকটাকালে সাধারণ মানুষের পাশে থাকুন, সাধারণ মানুষের আওয়াজকে নিয়ন্ত্রণ করুন। কিন্তু কবি যদি তাঁর পাঠক সমাজকে ভুলে গিয়ে, সাধারণ মানুষের আবেগকে বিসর্জন দিয়ে স্বার্থের জন্য, শাসকের জন্য কাজ করেন — তখন তো তিনি বিভক্ত হবেনই। কবি জয় গোস্বামী একজন বড় মাপের কবি, আজ তাঁর অপমান কবিতারই অপমান বলে আমি মনে করি। এই পরিস্থিতির জন্য তিনি নিজেই সবচেয়ে দায়ী। যে কোনো সাহিত্যসেবীকে , অক্ষর কর্মীকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে— হয় শাসকের অপকর্মের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে হবে কিংবা যদি শাসকের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে বা কলম ধরতে ভয় পান তাহলে অন্তত শাসকের পাশে দাঁড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। তবেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সম্মান বজায় থাকবে।