গভীর সমুদ্রে ফেরিতে আগুন — মৃত ৫, নিখোঁজ ৪১, উদ্ধার চলছে তল্লাশি
২ আগস্ট, কলকাতা, muthokotha.in: রবিবার সকালে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব উপকূলে ঘটে গেল আরও একটি মর্মান্তিক সমুদ্র দুর্ঘটনা। মাদুরা দ্বীপের কাছে একটি যাত্রীবাহী ফেরিতে হঠাৎ আগুন লেগে যায়। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় উদ্ধারকারী সংস্থা BASARNAS। পাশাপাশি ৪১ জন যাত্রী এখনও নিখোঁজ। নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে সমুদ্রে চলছে জোরদার উদ্ধার অভিযান।
সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাগ্রস্ত ফেরিটিতে মোট ২৭১ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য ছিলেন। রবিবার দুপুর পর্যন্ত ২২৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার হওয়া অনেকের শরীরে পোড়ার চিহ্ন ও ধোঁয়া শ্বাসের সমস্যা রয়েছে। তাঁদের নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ফেরিটি পূর্ব জাভার সুরাবায়া বন্দর থেকে ছেড়ে দক্ষিণ সুলাওয়েসির মাকাসার শহরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। এটি ইন্দোনেশিয়ার অভ্যন্তরীণ নৌপথের অন্যতম ব্যস্ত রুট। যাত্রাপথের মাঝামাঝি, মাদুরা দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছতেই সকালের দিকে আচমকা ইঞ্জিন কক্ষ বা নীচের ডেক থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখেন যাত্রীরা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা ফেরিতে।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন উদ্ধার হওয়া যাত্রী জানিয়েছেন, আগুন লাগার পর ফেরির মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। লাইফ জ্যাকেট ও লাইফবোট খোঁজার জন্য ছোটাছুটি শুরু হয়। অনেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেন। ধোঁয়ার কারণে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ক্রু সদস্যরা যাত্রীদের শান্ত করার চেষ্টা করলেও আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যায় কোস্টগার্ডের জাহাজ, মাছ ধরার নৌকা ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার। সমুদ্রে ভাসতে থাকা যাত্রীদের একে একে তুলে আনা হয়।
আগুনের সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। ইন্দোনেশিয়ার পরিবহণ মন্ত্রক ও জাতীয় পরিবহণ নিরাপত্তা কমিটি যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক অনুমান, ইঞ্জিনে ত্রুটি বা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে। তবে ফেরিতে অতিরিক্ত জ্বালানি বা দাহ্য পদার্থ বহন করা হচ্ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
BASARNAS-এর মুখপাত্র বলেন, “আমাদের অগ্রাধিকার এখন নিখোঁজদের উদ্ধার করা। একইসঙ্গে ফেরির ব্ল্যাক বক্স ও ক্রুদের বয়ান সংগ্রহ করে দুর্ঘটনার কারণ জানার চেষ্টা চলছে।”
ইন্দোনেশিয়া ১৭ হাজারের বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দেশ। ফলে নৌপথই এখানকার প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু প্রতি বছরই ফেরি দুর্ঘটনার খবর আসে। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, পুরনো জাহাজ, নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব এবং খারাপ আবহাওয়া — এই কয়েকটি কারণকে দায়ী করেন বিশেষজ্ঞরা।
২০১৮ সালে সুমাত্রার কাছে একটি ফেরি ডুবে ১৬০ জনের বেশি মারা গিয়েছিলেন। ২০২২ সালেও পূর্ব নুসা তেংগারায় ফেরি দুর্ঘটনায় বহু প্রাণহানি হয়। এই প্রেক্ষিতে রবিবারের ঘটনাও ফের একবার সরকারের নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল।
রবিবার বিকেল পর্যন্ত সমুদ্রে ১০টির বেশি উদ্ধারকারী জাহাজ ও ৩টি হেলিকপ্টার মোতায়েন ছিল। নিখোঁজ ৪১ জনের মধ্যে শিশু ও মহিলা রয়েছেন বলে আশঙ্কা। ঢেউ ও স্রোতের কারণে উদ্ধারকাজ কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট অফিসের তরফে শোকপ্রকাশ করা হয়েছে। পরিবহণ মন্ত্রী ঘটনাস্থলে উচ্চপর্যায়ের দল পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, “যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন তাঁদের পরিবারের পাশে সরকার আছে। নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে সবরকম চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মাদুরা ও সুরাবায়ার স্থানীয় জেলেরাও উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছেন। তাঁদের ছোট নৌকা করেই প্রথমে অনেক যাত্রীকে তীরে আনা হয়। একজন জেলে বলেন, “সমুদ্রে তখন মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। আমরা যা পেরেছি করেছি।”
সুরাবায়া বন্দরে তখন হাজারো মানুষের ভিড়। সবার চোখে জল, হাতে প্রিয়জনের ছবি। কেউ মাকাসারে যাওয়ার কথা ছিল, কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ আত্মীয়ের বাড়ি। নিখোঁজদের নামের তালিকা টাঙানো হয়েছে বন্দরে। উদ্ধার হওয়া এক যুবক কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার মা ও ছোট বোন এখনও নিখোঁজ। শেষবার ওদের ডেকে দেখেছিলাম আগুনের মধ্যে।”
আপাতত ৩ দিনের জন্য সুরাবায়া-মাকাসার রুটে সব ফেরি চলাচল খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। প্রতিটি ফেরিতে নিরাপত্তা সরঞ্জাম, যাত্রীর সংখ্যা ও লাইসেন্স পরীক্ষা করা হবে।
সমুদ্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তদন্ত নয়, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার। পুরনো ফেরি বাতিল, ক্রুদের প্রশিক্ষণ, এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস মেনে চলা — এই পদক্ষেপগুলো না নিলে এমন দুর্ঘটনা কিছুতেই থামবে না।
এদিন সমুদ্র শান্ত ছিল, কিন্তু ফেরির ভিতরটা তখন আগুনের নরক। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ৫টি প্রাণ ঝরে গেল, ৪১টি পরিবার এখনও অন্ধকারে। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এই ৪১ টি প্রাণ।
ইন্দোনেশিয়ার জন্য এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। দ্বীপরাষ্ট্রের লাখো মানুষের জীবন যাঁদের হাতে, সেই নৌ-পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, আরও মানবিক করে তোলার সময় এখনই।
নিখোঁজদের পরিবার এখনও আশায় বুক বেঁধে আছেন — সমুদ্র ফিরিয়ে দেবে তাঁদের প্রিয়জনকে। উদ্ধারকারী দলগুলোও হাল ছাড়েনি। মাদুরার জলের বুকে এখনও খোঁজ চলছে।