এগরায় বর্ণাঢ্য উল্টো রথ, ছোটদের রথে ভাসলো শিল্প-সংস্কৃতির ভাবনা
অলকেশ মাইতি, এগরা, ৩০ জুলাই, পূর্ব মেদিনীপুর: শ্রাবণ মাসের শুরুতেই উল্টোরথের পুণ্য তিথি। আর সেই তিথিতেই খুদেদের হাসি, রঙ আর আনন্দে সেজে উঠল এগরা মহকুমার সবচেয়ে বৃহৎ ও সুবিখ্যাত পটলাইকা মার্কেট, বৃষ্টির ভ্রুকুটিও হার মানাতে পারেনি ছোটদের ছোট ছোট আশাকে।
টানা আট বছর ধরে চলে আসছে এই ব্যতিক্রমী উৎসব। এগরার এই ছবিটা শুরু থেকে এখনো অবধি বদলায়নি। প্রতি বছর উল্টোরথে ক্লাব ‘গোল্ডেন ফিউচার’-এর উদ্যোগে এবং পটলাইকা মার্কেটের পরিচালনায় বসে এই এই প্রতিযোগিতামূলক উৎসব । এবার ছিল “অষ্টম বর্ষের প্রয়াস। বলা যায়, শিল্প ও সংস্কৃতির চেতনায় এটি এখন শুধু একটি প্রতিযোগিতার জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই , এগরা মহকুমা এলাকার মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
রঙে-রথে-আনন্দে যখন খুদেরা মেতে ওঠে, তখন বড়দের হাসিমুখের ছবিটা অত্যন্ত তৃপ্তির মনে হয়। এবছর উল্টোরথের দিন অর্থাৎ শুক্রবার দুপুর থেকেই পটলাইকা মার্কেট চত্বর ভরে উঠেছিল রঙ-বেরঙের ছোট ছোট রথে। কাগজ, কাঠ, পিচবোর্ড, কাপড়, প্লাস্টিক — যা পেরেছে তাই দিয়ে নিজের কল্পনার রথ সাজিয়ে এনেছে খুদেরা।
কারও রথে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার মূর্তি, কারও রথে ফুল-লতাপাতার কাজ, কারও আবার থিম ভাবনায় পরিবেশ সচেতনতার বার্তা। এবার ১৫০০টি রথ মাঠে জড়ো হয়েছিল।খুদেদের কলতানে, “জয় জগন্নাথ” ধ্বনিতে গোটা এলাকা উৎসবের চেহারা নেয়। জনপ্লাবনে থৈ থৈ করছিল উৎসব প্রাঙ্গণ। প্রতিযোগিতাকে সুষ্ঠুভাবে চালানোর জন্য অংশগ্রহণকারী শিশুদের বয়স ও রথের ধরন অনুযায়ী দুপুর ৩টে নাগাদ চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয়, Group A, B, C, D। এতে ছোট-বড় সকলেই সমান সুযোগ পায় নিজেদের প্রতিভা দেখানোর জন্য।
তখন সন্ধ্যা ৬টা। মাঙ্গলিক প্রদীপ প্রজ্জ্বালনের মধ্য দিয়ে মূল মঞ্চে শুভ সূচনা হয় অনুষ্ঠানের। উপস্থিত ছিলেন মহকুমা এলাকার বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি। এদিন বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন —
মহকুমা পুলিশ অফিসার আবু নুর হোসেন, এগরা থানার I.C সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়, এগরা পৌরসভার পৌরপ্রধান স্বপন কুমার নায়ক, ৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দেবব্রত করন।
এছাড়াও ছিলেন সমাজসেবী সুকুমার খাটুয়া, বনবিহারী পাত্র, সুধাম পন্ডিত, চন্দন মাইতি, স্বপন দত্ত, বীরেন নায়ক, প্রকাশ কুসুম দাশ, তারাপদ পাহাড়ি, রবিপদ মাইতি, সৈকত সাহু, বাদল সাউ, অরূপ বেরা, সৌম্যদীপ শাসমল, সুমিত জানা, নারায়ণ চন্দ্র বেরা প্রমুখ।
সম্মানীয় অতিথিরা খুদে শিল্পীদের উৎসাহ দেন। তাঁরা বলেন, “এই রথ শুধু কাঠ আর কাগজের নয়, এটা ক্ষুদে শিল্পীদের স্বপ্নের রথ।”
বিকেল জুড়ে চলে এই চোখ ধাঁধানো বর্ণাঢ্য রথ পরিক্রমা। এরপর রাত ৮ টা ৩০ মিনিটে শুরু হয় পুরস্কার বিতরণ। এবার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়র পাশাপাশি সমস্ত অংশগ্রহণকারীকেই বিশেষ পুরস্কার প্রদান করা হয়। কারণ আয়োজকদের মতে, “এখানে কেউ হারেনি। যে রথ বানিয়ে এনেছে, সে-ই জয়ী।”
এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তথা ‘ গোল্ডেন ফিউচার ‘ক্লাবের শিল্প-সংস্কৃতির পাঠশালার এই আয়োজনের পিছনে যে ভাবনা কাজ করছে, তা খুব স্পষ্ট। ক্লাবের প্রধান উপদেষ্টা হরিপদ পন্ডা বলেন, “আমরা সম্মিলিতভাবে এই রথ প্রতিযোগিতা করে আসছি দীর্ঘ আট বছর ধরে। প্রথমে দুটি গ্রুপ ছিল, এখন চারটি করা হয়েছে। মূল পুরস্কারের সংখ্যাও বেড়েছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে বাচ্চারা সবসময় মোবাইল-টিভিতে আটকে থাকছে। তাদের কল্পনাশক্তি, হাতের কাজ, শৈল্পিক সত্তা হারিয়ে যাচ্ছে। এই রথ তৈরি আর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে আমরা চাই ওরা নিজের হাতে কিছু করুক, ভাবুক, সৃষ্টি করুক। রথ তৈরি সংস্কৃতিরই একটা অঙ্গ। এই অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই ভাবনাই ওদের মধ্যে প্রবাহিত হোক।”
সত্যিই তাই। একটা রথ বানাতে গেলে বাচ্চাকে ভাবতে হয়, ডিজাইন করতে হয়, রং করতে হয়, গল্প বলতে হয়। এটা শুধু খেলা নয়, এটা হাতে-কলমে এক নান্দনিক শিল্পশিক্ষা।
ক্লাবের সম্পাদক নান্টু জানা এবং সভাপতি রাজকুমার মিশ্রের অক্লান্ত পরিশ্রমেই এই অষ্টম বর্ষের অনুষ্ঠান সাফল্য পেয়েছে। সারাদিনের অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা হরিপদ পন্ডা।
উল্টোরথ মানেই জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়া। এই গল্প ছোটবেলা থেকেই বাঙালির মনে গেঁথে আছে। কিন্তু আজকের প্রজন্ম সেই গল্প, সেই লোকসংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই ‘গোল্ডেন ফিউচার’-এর এই উদ্যোগ সেই শূন্যস্থানটাকে ভরাট করছে। রথের মাধ্যমে ধর্ম, সংস্কৃতি, শিল্প আর আনন্দ — সবকিছু একসাথে খুদেদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক অনবদ্য প্রচেষ্টা।
এগরা পুরুষোত্তমপুরের এক অভিভাবক স্বপন জানা বলেন, “আমার ছেলে সারা সপ্তাহ ধরে রথ বানিয়েছে। ইউটিউব দেখে নয়, নিজের মাথা খাটিয়ে। এই আনন্দটা মোবাইলে পাওয়া যায় না। সে কোনো পজিশন পেলো কিনা সেটা বড়ো কথা নয়, তার নিজের চিন্তাধারাকে সে তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছে — এটাই আমার কাছে মূল্যবান।”
অনুষ্ঠানের শেষে ক্লাবের সভাপতি রাজকুমার মিশ্র জানান, এই ধারা ভবিষ্যতেও চলবে। “আমরা চাই এগরা মহকুমা এলাকার প্রতিটি বাচ্চা বছরে অন্তত একবার এই রথের উৎসবে সামিল হোক। তাদের ভবিষ্যৎ জীবন সুন্দর হোক, তারা সাংস্কৃতিক চেতনা নিয়ে বড় হোক–এটাই আমাদের কামনা।”
টাকা-পয়সা, প্রাইজ — এগুলো বড় কথা নয়। বড় কথা হল, একটা ছোট শহরে ১৫০০টা রথ একসাথে। ১৫০০টা শিশু মস্তিষ্কের কল্পনা একসাথে। ডিজিটাল দুনিয়ার ভিড়ে এগরার পটলাইকা মার্কেটে আজ যে শিল্প-সংস্কৃতির বীজ বপন হলো, তা একদিন মহীরুহ হয়ে উঠবে — এমনটাই আশা এলাকাবাসীর।