২৯ জুলাই, কলকাতা, muthokotha.in : কী অদ্ভুত সমাপতন! আজ গুরুপূর্ণিমা। গুরুকে স্মরণের দিনেই বাংলা তথা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল।
জীবনের ১০০ টি বসন্ত পার করে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রবীণতম প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠসংগীতশিল্পী পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালের উডবার্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার দুপুরে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই শতায়ু কিংবদন্তি। তাঁর প্রয়াণে সঙ্গীতমহল তো বটেই, সমগ্র সাংস্কৃতিক জগতে এখন গভীর শোক।
এই বছর ২১ ফেব্রুয়ারি, মাতৃভাষা দিবসের দিনই ১০০ বছরের মাইলফলক পার করেছিলেন এই সুরসাধক। সেদিনও থামেননি তিনি। কলকাতার গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে শতবর্ষ উদযাপনের মঞ্চে মিনিট চল্লিশের উপর সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। সংগীত জগতে সেই সুরই তাঁর শেষ উপহার হয়ে রইল।
বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা তো ছিলই, তারই মধ্যে দিন কয়েক আগে নিজের বাড়িতে পড়ে গিয়ে তাঁর হিপ বোন ভেঙে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় শিল্পীকে। কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরেছিলেন। কিন্তু বয়সের কারণে মারাত্মক ইনফেকশন হয়ে যায়।
দিন চারেক আগে তাঁকে আবার SSKM-এর উডবার্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করাতে হয়। কিন্তু মোটেও পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না। শিল্পী একরকম ঘোরের মধ্যেই ছিলেন। সেই ঘোরের মধ্যেই বুধবার দুপুরে তিনি চিরবিদায় নিলেন।
ছেলে পণ্ডিত শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় জানান আজ গুরু পূর্ণিমা। আজকের দিনটাতেই বাবাকে চলে যেতে হলো।
১৯২৭ সালে জন্ম অমিয়রঞ্জনের। সাঙ্গীতিক পরিবেশেই বড় হওয়া। বাঙালির নিজস্ব শাস্ত্রীয় ঘরানা ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’র অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন অমিয়রঞ্জন।
এই ঘরানারই আর এক স্তম্ভ অর্থাৎ তাঁর পিতা ও গুরু পণ্ডিত সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সান্নিধ্য ও তালিমে নিজেকে গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে খেয়াল পরিবেশনায় তিনি যে নিজস্বতার ছাপ রেখে গেছেন, তা আজকের খেয়াল গায়কদের কাছে এক বিশাল পাঠশালা।
তাঁর গায়কির প্রধান গুণ ছিল সুর ও শব্দের উচ্চারণশৈলী। তিনি বিশ্বাস করতেন, অহেতুক কসরত বা অতিরিক্ত তানের আড়ম্বর দিয়ে শ্রোতাকে মুগ্ধ করার চেয়ে সুরের আত্মার সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটানো অনেক বেশি জরুরি। রাগের বিস্তার এবং ধীর গতিতে রাগ রূপায়ণের বিরল ক্ষমতা ছিল তাঁর।
মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশনের পাশাপাশি অমিয়রঞ্জন ছিলেন শিল্পী গড়ার কারিগর। তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি ব্যয় করে গেলেন ছাত্র-ছাত্রীদের তালিম দিতে দিতে।
বাবার দেখানো পথ ধরে পুত্র পণ্ডিত শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিষ্ণুপুর ঘরানার ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন। পাশাপাশি স্বর ও সুর নিয়ে গবেষণাও করছেন।
অমিয়রঞ্জনের প্রয়াণে বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রবীণ প্রজন্মের প্রত্যক্ষ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। বুধবার বিকেলেই কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে এই মহান সুরসাধকের।
পিতা যখন গুরু, তখন সুর তো স্বর্গীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অমিয়রঞ্জনের গুরুদেব পিতা সত্যকিঙ্কর, আর শান্তনুর গুরুদেব পিতা অমিয়রঞ্জন। গুরুপূর্ণিমার দিনে গুরু চলে গেলেন। রেখে গেলেন একশো বছরের সাধনা, অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী এবং এক অনন্য সুরের উত্তরাধিকার।