“মা, আমাদের সামনের দিন ভালো আসবে” — বলতে বলতেই থেমে গেল ২৫ বছরের মিলনের নিঃশ্বাস
অলকেশ মাইতি, ২৮ জুলাই,পটাশপুর, পূর্ব মেদিনীপুর: মাত্র ২৫ বছরের একটা জীবন। ছিল অন্তহীন রঙিন স্বপ্ন। মা-ভাইকে নিয়ে ছোট্ট সংসার গোছানোর লড়াই ছিল নিত্যসঙ্গী। আর তারপর এক রাতে দুঃস্বপ্নের কালোমেঘের হানায় সব শেষ হয়ে গেল।
এগরার ভাড়া বাড়িতে সোমবার গভীর রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল মিলন সাহু। কিডনির মারণ রোগ কেড়ে নিল শান্ত, ভদ্র, পরিশ্রমী এই ছেলেটাকে। মায়ের আঁচল জড়িয়ে ঘুমাতে যাওয়া ছেলেটা আর ফিরল না তার স্বপ্নের মাটিতে।
বাবাহারা ছেলের সংসার গোছানোর লড়াই ছিল অদম্য। সেই লড়াই করতে করতে, স্বপ্ন দেখতো অনেক। মিলনের ছেলেবেলা কেটেছে প্রচণ্ড অভাবের মধ্যে। খুব ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছে সে। তারপর থেকে মা কাজল দেবী আর ছোট ভাইকে নিয়ে থাকত পটাশপুরের খাড় গ্রামে মামার বাড়িতে।
পড়াশোনা শেষ করে মায়ের কাঁধের বোঝা হালকা করতেই নেমে পড়েছিল কাজে। প্রথমে খাড় বাজারে ফাস্টফুডের দোকান। ঘর ভাড়া নিয়ে নিজেই সব সামলাত। তারপর সুযোগ পেল আমাজন ইন্ডিয়ায়। কাজের জন্য চলে এল এগরায়। এখানেও ঘর ভাড়া। মা, ভাই আর সে — এই তিনজনের ছোট্ট সংসার।
পাড়ার লোকেরা বলে, “মিলন খুব ভালো ছেলে ছিল। কারও সঙ্গে ঝগড়া নেই, রাগ নেই। খুব শান্তশিষ্ট, নম্র। উপার্জনের প্রতিটা টাকা মায়ের হাতে তুলে দিত।”
মিলন বহুবার মা’কে বলেছে, “মা, তুমি আর অন্যের বাড়ির কাজ কোরো না। আমি আছি তো।” কিন্তু মা কাজল দেবী রাজি হননি। তাঁর একটাই কথা ছিল — “সবাই কম-বেশি উপার্জন করলে তবেই তো আমরা নিজেদের একটা ছোট্ট ঘর বানাতে পারব রে।”
ছেলের স্বপ্ন ছিল মায়ের নামে একটা পাকা বাড়ি। মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলেকে বড় করে তোলা। দুজনের চোখেই ছিল রঙিন ভবিষ্যতের ছবি। কিন্তু ভাগ্য অন্য ছবি এঁকে রেখেছিল।
বছর খানেক আগেই ধরা পড়ে কিডনির মারাত্মক রোগ। ভিন্ রাজ্যেও চিকিৎসার জন্য মা তার ছেলেকে নিয়ে গেছেন। মাসখানেক ধরে সপ্তাহে দুবার ডায়ালাইসিস হতো। শরীর ভেঙে যাচ্ছিল, তবুও কাজ ছাড়েনি মিলন। বলত, “ডায়ালাইসিস করিয়ে আবার কাজে যাব মা।”
ডাক্তাররা নিদান দিলেন, একমাত্র ভরসা কিডনি প্রতিস্থাপন। খরচ প্রায় ১৬ লক্ষ টাকা। গরীব মা দমে যাননি। নিজের কিডনি দিয়ে ছেলেকে বাঁচাতে মরিয়া চেষ্টা শুরু করলেন । আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাছে হাত পাতলেন। কিন্তু টাকার পাহাড় আর সময় — দুটোই যে ফুরিয়ে আসছিল, তা কেউই বুঝতে পারেনি।
সবচেয়ে বড় আঘাতটা এল যখন ডাক্তার বললেন, “মায়ের কিডনি পেলেও ছেলেকে বাঁচানো যাবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই।” তবুও মা হাল ছাড়েননি। বলেছিলেন, “শেষ চেষ্টা করে যাবো। তুই ভালো হয়ে যাবি বাবা, তোর কিচ্ছু হবে না। সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে।”
সোমবার রাত ৯টার দিকে কলকাতার পি.জি হাসপাতাল থেকে ডায়ালাইসিস করিয়ে ছেলেকে নিয়ে এগরার ভাড়া বাড়িতে ফেরেন মা। রাত ২টা পর্যন্ত মা’কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিল মিলন। দুর্বল গলায় বলছিল,– “মা, চিন্তা কোরো না। আমাদের সামনের দিনগুলো ভালো হবে।” মা ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর অনেক চেষ্টা করছিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। সারারাত ধরে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছিল, বইছিল শীতল বাতাস।
রাত আড়াইটা নাগাদ হঠাৎ শ্বাসকষ্ট। মুহূর্তে সব ওলট-পালট। খবর পেয়ে খাড় থেকে মামা অমিত দাস ছুটে গেলেন । মিলনকে নিয়ে যাওয়া হল এগরা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। ডাক্তাররা শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। ২৫ বছরের জীবনযুদ্ধ সেখানেই থেমে গেল। ফুলের গন্ধ ছড়াতে চেয়েছিল যে ছেলেটি, সেই ছেলেটির শরীর ঢাকবার জন্য রাশি রাশি ফুল অপেক্ষা করতে লাগলো।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই এগরার ভাড়া বাড়িতে ভিড়। মায়ের কান্না আর থামছে না। বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন কাজল দেবী। বলছেন, “আমার কিডনিটাও দেওয়ার সুযোগ দিল না। মা হয়ে ছেলেকে আমি বাঁচাতে পারলাম না।” ছোট ভাই ঝুলন দাদার মৃতদেহ আঁকড়ে নির্বাক হয়ে বসে আছে।
পাড়ার মহিলারা বলছেন, “এমন ছেলে হয় না। নিজে না খেয়ে মা-ভাইকে খাওয়াত।”
মিলনের মৃত্যু শুধু একটা পরিবারের ক্ষতি নয়। এটা আমাদের সিস্টেমের কাছেও প্রশ্ন। একজন ২৫ বছরের ছেলে, যে সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিল, যার চিকিৎসার জন্য ১৬ লক্ষ টাকা জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল — সে কি এভাবেই হারিয়ে যাবে? সরকারি সাহায্য, স্বাস্থ্যসাথী — সব থেকেও শেষ পর্যন্ত টাকার অভাবে চিকিৎসা আটকে গেল। মা নিজের কিডনি দিতেও রাজি ছিলেন। তবুও হল না।
মিলন চলে গেছে। রেখে গেছে তার নিজের এবং তার মায়ের অসম্পূর্ণ স্বপ্ন, একটা ছোট্ট ঘরের ইচ্ছা, আর “সামনের দিন ভালো হবে” — এই শেষ কথাগুলো।
আজ এগরার সেই ভাড়া বাড়িটা নিঃশব্দ। যেখানে রাত ২টা পর্যন্ত মা-ছেলে ভবিষ্যতের গল্প করছিল, সেখানেই এখন শুধু কান্না। মিলন সাহুর মতো ছেলেরা হারিয়ে গেলে সমাজেরও অনেকটা ক্ষতি হয়ে যায়। কারণ ওরা হার মানে না। ওরা লড়ে। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মায়ের হাত ধরে ওরা লড়তে জানে!