কালনা, পূর্ব বর্ধমান, ২৬ জুলাই, Muthokotha.in : বড়কোবলা গ্রামে এখন সকাল হলেই আকাশে কালো ঝাঁক। তবে তা মেঘ নয়, শুঁয়োপোকা । একটা ছোট পোকা যে গোটা গ্রামের জনজীবন তছনছ করে দিতে পারে, তা কালনার পূর্বস্থলী-১ ব্লকের শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বড়কোবলার এই ঘটনা না পড়লে বিশ্বাসই করবেন না। গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে শুঁয়োপোকার ভয়াবহ উপদ্রবে অতিষ্ঠ এলাকার কয়েকশো পরিবার। পরিস্থিতি এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, আতঙ্কে কয়েকটি পরিবার ঘর-বাড়ি ফেলে সাময়িকভাবে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত হতে হয়েছে কয়েকজন শিশু ও বয়স্ককে।
বড়কোবলা গ্রামে এখন সকাল হলেই আকাশে কালো ঝাঁক। তবে তা মেঘ নয়, শুঁয়োপোকা । গাছের পাতা থেকে, পাট ক্ষেত থেকে, নর্দমা থেকে দলে দলে নেমে আসছে তারা। বাড়ির দেওয়াল, জানলা, রান্নাঘরের হাঁড়ি-কড়াই, খাবার, পানীয় জল — কোথাও যেতে বাকী নেই ওই শুঁয়োপোকাদের ।
স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, পোকাগুলির গায়ের সূক্ষ্ম বিষাক্ত লোম বাতাসে উড়ছে। সেই লোম শ্বাসের সঙ্গে ঢুকছে, পড়ছে খাবারে। ফলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
ওই লোম গায়ে পড়লে, সারা গায়ে অসহ্য জ্বালা ও চুলকানি হচ্ছে, অ্যালার্জি দেখা দিচ্ছে , গায়ে র্যাশ বেরিয়ে যাচ্ছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও শ্বাসকষ্ট ও গলা চুলকানো তো আছেই। সেইসঙ্গে আবার খাবারে লোম পড়ে বমি, পেটের সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।
গত ১০ দিনে ৪০ জনের বেশি মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। ৫ জন শিশু ও ২ জন বয়স্ককে কালনা মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩ জন এখনও সম্পূর্ন সুস্থ হয়নি।
এলাকার বাসিন্দারা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “রাতে ঘুমাতে পারি না। সারা গা চুলকায়। বাচ্চাদের গায়ে ফোস্কা বেরিয়ে গেছে। ডাক্তার বলছে পোকার লোমের অ্যালার্জি।”
পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ ৩০-৩৫টি পরিবারের ক্ষেত্রে। তাদের বাড়ির পাশেই বড় পাট ক্ষেত। সেখান থেকেই পোকার আক্রমণ সবচেয়ে বেশি হচ্ছে বলে জানা গেছে।বাধ্য হয়ে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মীয়ের বাড়ি, আবার কেউ কেউ পাশের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন। ঘরের জিনিসপত্র, গবাদি পশু ফেলে রেখে বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয়েছে।
বৃদ্ধা সরস্বতী দাস বলেন, “৬০ বছর ধরে এই গ্রামে আছি। এমন দিন দেখিনি। উঠোনে পা ফেলা যাচ্ছে না। সব জায়গায় পোকা। ভয়ে ছেলের কাছে, তার বাসায় চলে এসেছি। কবে যে বাড়ি ফিরতে পারব কে জানে।”
গ্রামবাসীদের একাংশের দাবি, “এর নেপথ্যে রয়েছে ব্যাপক হারে পাট চাষ। গত কয়েক বছরে সরকারি উৎসাহে এই এলাকায় পাট চাষ প্রচুর বেড়েছে। পাট গাছই শুঁয়োপোকার প্রিয় খাবার। সেই পাটক্ষেত থেকে ওরা লোকালয়ে হামলা চালাচ্ছে। পাট কাটার সময় ঠিকমতো কীটনাশক দেওয়া হয়নি। তারপর বৃষ্টি হওয়ায় পোকার বংশ দ্রুত বেড়েছে। এখন তারা খাবার শেষ করে লোকালয়ে ঢুকছে।”
টানা গরমের পর হঠাৎ বৃষ্টিতে পোকার প্রজনন বেড়েছে বলে মত পরিবেশবিদদের।
বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভ শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এবং কৃষি দপ্তরের উপর। তাঁদের অভিযোগ, সমস্যা শুরুর ৩ দিনের মাথাতেই পঞ্চায়েতকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত মাঠে কোনও কীটনাশক স্প্রে হয়নি।
গ্রামের যুবক রঞ্জিত মণ্ডল বলেন, “আমরা ৩ বার ডেপুটেশন দিয়েছি। পঞ্চায়েত প্রধান বলেছেন ‘দেখছি’। কিন্তু মাঠে কোনও গাড়ি, কোনও ওষুধ আসেনি। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে আজ এই অবস্থা হত না।”
গ্রামবাসীরা দাবি করেন — অবিলম্বে ড্রোন বা গাড়ির মাধ্যমে গোটা এলাকায় কীটনাশক ও জীবাণুনাশক ওষুধ ছড়ানো হোক। আক্রান্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্য এবং বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। কৃষি দপ্তরের বিশেষজ্ঞ দল এসে পাট ক্ষেতে জরুরি ভিত্তিতে ওষুধ প্রয়োগ করুক।
শুঁয়োপোকার উপদ্রবের জেরে গ্রামের স্বাভাবিক জীবন স্তব্ধ। প্রাথমিক স্কুলে ছাত্রছাত্রীর হাজিরা ২০ শতাংশে কমেছে। বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। সব্জি বিক্রেতারা বাজারে সব্জি ঢেকে রেখে বিক্রি করছেন, তবুও তার মধ্যে পোকার লোম পড়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ বাড়িতে রান্না বন্ধ করে হোটেল থেকে খাবার আনতে বাধ্য হচ্ছে। সেই খাবার খোলা রাখলেই মুহূর্তে লোম পড়ে যাচ্ছে। চাষের জন্য মাঠে কাজ করতে যাওয়া বন্ধ।
তবে স্থানীয় BDO অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কৃষি দপ্তরের একটি টিম এলাকা পরিদর্শনে আসতে পারে।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. অমিতাভ সেন বলেন, “এটি সম্ভবত ‘হেয়ারি ক্যাটারপিলার’ প্রজাতির শুঁয়োপোকা। এদের গায়ের লোমে ‘হিস্টামিন’ জাতীয় পদার্থ থাকে। তা থেকেই অ্যালার্জি হয়। দ্রুত জৈব কীটনাশক এবং ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করতে হবে। নাহলে আগামী ১ মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, আক্রান্তরা যেন গা ঢাকা জামা পরে, জানলা-দরজা নেট দিয়ে ঢাকে এবং ফোটানো জল খায়।
একটি পোকার কাছে হার মানছে গোটা গ্রাম।
বড়কোবলার এই ঘটনা শুধু একটি গ্রামের সমস্যা নয়। এটি প্রশাসনিক উদাসীনতা, সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ার ফল। যে গ্রামের মানুষ সারাবছর পাট চাষ করে রাজ্যের অর্থনীতিতে অবদান রাখে, আজ সেই গ্রামবাসীই পাটের কারণে ঘরছাড়া।