চন্দ্রকোনা, পশ্চিম মেদিনীপুর, ২৭ জুলাই ,muthokotha.in: সোমবার বিকেলের শান্ত রাস্তা মুহূর্তে পরিণত হল রণক্ষেত্রে। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনার কালিকাপুর এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও লরির মুখোমুখি ভয়াবহ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৫ থেকে ৪০ জন। অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মৃত্যুর আশঙ্কা থাকায় গোটা এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ঘটনার পর ঘণ্টা দুয়েক ধরে চলে উদ্ধারকাজ।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, মেদিনীপুর থেকে ছেড়ে আসা একটি বেসরকারি যাত্রীবাহী বাস কালিকাপুরের দিকে আসছিল। বাসে ছিলেন প্রায় ৫০-৫৫ জন যাত্রী। তাঁরা মেদিনীপুরে একটি বিশেষ ‘গো মাতা সম্মান’ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন।
ঠিক সেই সময় বিপরীত দিক থেকে আসছিল একটি পণ্যবাহী লরি। কালিকাপুরের সরু বাঁকের কাছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লরিটি নিজের লেন ছেড়ে বাসের সামনে চলে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সজোরে ধাক্কা লাগে দুটি গাড়ির। বাসটি প্রচণ্ড গতিতে চলছিল বলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
ধাক্কা এতটাই জোরে ছিল যে বাসের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে লরির মধ্যে ঢুকে যায়। কাঁচ ভেঙে, সিট ছিটকে যাত্রীরা ছিটকে পড়েন রাস্তায়। চারপাশে আর্তনাদ, কান্না আর ধুলোর মেঘ।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই কালিকাপুর ও আশেপাশের গ্রামের মানুষ ছুটে আসেন। রাস্তায় পড়ে থাকা আহতদের টেনে বার করেন তাঁরাই। ভেঙে পড়া বাসের দরজা-জানলা ভেঙে ভিতরে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধার করেন।এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আওয়াজ শুনে দৌড়ে এসে দেখি রক্তারক্তি কাণ্ড। বাচ্চা-বুড়ো সবাই চিৎকার করছে। আমরা জল, কাপড় নিয়ে ছুটেছি। অ্যাম্বুলেন্স আসার আগে অনেককেই হাসপাতালে পাঠিয়েছি টোটো-ভ্যানে করে।”
প্রায় ২০ মিনিট পর চন্দ্রকোনা থানার পুলিশ ও দমকলের ২টি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। শুরু হয় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ।প্রাথমিকভাবে স্থানীয়রা বলছেন — এই দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা ৪০ ছাড়াবে। আহতদের মধ্যে ১২ জনের অবস্থা গুরুতর।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন শিশু, মহিলা ও বয়স্ক মানুষ। সকলেই ‘গো মাতা সম্মান’ অনুষ্ঠান থেকে ফিরছিলেন বলে জানা গেছে।
আহতদের প্রথমে চন্দ্রকোনা গ্রামীণ হাসপাতাল ও ক্ষীরপাই সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ৮ জনকে পরবর্তীতে মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় বাসের চালক। দুর্ঘটনার সময় স্টিয়ারিংয়ের সঙ্গে আটকে যান তিনি। প্রায় ৪০ মিনিটের চেষ্টায় তাঁকে কাটার দিয়ে বার করা হয়। বর্তমানে তাঁর অবস্থা সংকটজনক। তাঁকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
লরির চালক ও খালাসির খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধাক্কার পর তারাই প্রথম পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ। দুর্ঘটনার পর প্রায় দেড় ঘণ্টা চন্দ্রকোনা-ক্ষীরপাই রাজ্য সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। দুমড়ানো বাস ও লরিটি রাস্তার মাঝখানে পড়ে থাকায় যানজট তৈরি হয় কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত।
পরে ক্রেন দিয়ে গাড়ি দুটিকে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। চন্দ্রকোনা থানার পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। লরির গতিবেগ ও চালকের গাফিলতি রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাস ও লরি দুটিকেই আটক করেছে পুলিশ।
যাঁরা আহত হয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই চন্দ্রকোনা ও আশেপাশের গ্রামের বাসিন্দা। ধর্মীয় অনুষ্ঠান সেরে বাড়ি ফেরার পথে এই বিপদে পরিবারে নেমেছে শোক।
হাসপাতালের বাইরে ভিড় করেছেন আত্মীয়রা। এক আহতের স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “সকালে হাসিমুখে বেরোল। বলল পুজো সেরে আসছি। এখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে।”
ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে যান স্থানীয় বিধায়ক ও প্রশাসনিক কর্তারা। আহতদের চিকিৎসার সবরকম ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের দাবি, কালিকাপুরের এই বাঁকটি খুব বিপজ্জনক। এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁদের আবেদন, রাস্তা চওড়া করা হোক, স্পিড ব্রেকার ও সিগন্যাল বসানো হোক যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের রাজ্য সড়কে লরি ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের মূল কারণ ওভারস্পিড ও লেন না মানা। বিকেলের সময় দৃশ্যমানতা কম থাকায় চালকরা প্রায়শই ভুল করেন। একটি মুহূর্তের অসাবধানতা কেড়ে নিতে পারে বহু প্রাণ। ‘গো মাতা সম্মান’ সেরে বাড়ি ফেরার আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হল হাসপাতালের বেডে।
চন্দ্রকোনার কালিকাপুরের এই দুর্ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিল সড়ক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা। প্রশাসন দ্রুত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এবং আহতরা সুস্থ হয়ে উঠবেন — এই কামনাই এখন গোটা এলাকার।