২৫ জুলাই, muthokotha.in: যুদ্ধ শেষ হলেই কি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে এক নতুন বিপদ? ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আমেরিকা-ইরান সংঘাত প্রায় পাঁচ মাসে পৌঁছেছে। এই সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি অচল। আর এর ফলেই বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, সামুদ্রিক আক্রমণাত্মক প্রজাতির এক ‘সুপার–স্প্রেডার’ সংকট আসন্ন।
হরমুজে আটকে ১৫০০ জাহাজের মধ্যে শতাধিক জাহাজে জন্ম নিচ্ছে ‘বায়োফাউলিং’। এটি খুবই মারাত্মক জায়গায় পৌঁছাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বহু চর্চিত এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি বাণিজ্য হয়। প্রণালী বন্ধ থাকায় বর্তমানে প্রায় ১,৫০টি বাণিজ্যিক জাহাজ পারস্য উপসাগরে এবং কয়েকশো জাহাজ ওমান উপসাগরে দীর্ঘদিন ধরে নোঙর করে রয়েছে।
দীর্ঘদিন এক জায়গায় স্থির থাকার ফলে জাহাজের তলায় শুরু হয়েছে বায়োফাউলিং । জলের নীচের অংশে প্রথমে শৈবাল ও আঠালো স্তর, তারপর বার্নাকল, মাশেল ও বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণীর উপনিবেশ গড়ে উঠছে, যা শুধু জাহাজের সাস্থ্য নয় বিভিন্ন দেশের সমুদ্র বন্দর থেকে স্থলভাগের সাস্থ্যের পক্ষে ও মারাত্মক ক্ষতিকারক।
‘Biological Invasions’ জার্নালে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় UMCES ও WHOI-সহ ২৪ জন সামুদ্রিক বিজ্ঞানী সতর্ক করেছেন – বাণিজ্য স্বাভাবিক হলেই এই জীবগুলো জাহাজের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে পৌঁছে যেতে পারে।
WHOI-এর বিজ্ঞানী ক্যারোলিন টেপোল্ট বলেন, “সামুদ্রিক আক্রমণাত্মক প্রজাতিগুলো নতুন পরিবেশে খুব দ্রুত খাপ খাইয়ে নেয়। একবার তারা বসতি গড়লে তাদের নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব।”
উদাহরণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা ‘এশিয়ান গ্রিন মাশেল’-এর কথা বলছেন। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর থেকে উৎপন্ন এই মাশেল এখন আরব উপসাগরে ব্যাপক। ইতিমধ্যেই এটি ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আটলান্টিকে ছড়িয়ে স্থানীয় প্রজাতির ক্ষতি করছে।
এছাড়া বায়োফাউলিং শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিকেও আঘাত করছে। IMO-র তথ্য অনুযায়ী, জাহাজের গায়ে জমা শৈবালের পাতলা স্তর গ্রিনহাউস গ্যাস ২০-২৫% বাড়ায়। বার্নাকল জমলে জ্বালানি খরচ ও কার্বন নির্গমন ৫০% পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী শিপিং শিল্পের মোট জ্বালানির ১০% খরচ হয় শুধু এই অতিরিক্ত প্রতিরোধ কাটাতেই।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু সমুদ্রেই নয়, স্থলেও এসে পড়েছে। ঐতিহাসিকভাবে পরিবেশ সুরক্ষায় অগ্রণী ইরান এখন বহু বছরের খরা ও অব্যবস্থাপনার চাপে। ইরানের পরিবেশ দফতরের ২০২৪-এর রিপোর্ট অনুযায়ী দেশটিতে ৮৬টি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে আছে এশিয়াটিক চিতা, পার্সিয়ান ফ্যালো হরিণ, চিতাবাঘ, পার্সিয়ান ওনাগার, গ্রেট বাস্টার্ড-এর মতো বিরল প্রাণী।
গবেষকরা শিপিং কোম্পানি, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যে, জাহাজ ছাড়ার আগে অবশ্যই হাল ও প্রপেলার পরিষ্কার করতে হবে। IMO-র নিয়ম অনুযায়ী ৩০ দিনের বেশি নোঙর করা জাহাজের জন্য এটি বাধ্যতামূলক। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বন্দরে নজরদারি বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বর্তমানে বিভিন্ন উপসাগরের বন্দরে ডুবুরি দিয়ে জাহাজ পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে। তবে তাড়াহুড়োর কারণে প্রতি জাহাজ পরিষ্কারের খরচ ৬০% বেড়ে প্রায় ৮,০০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
যুদ্ধ থামলেই বাণিজ্য ফিরে আসবে সব দেশের জাহাজ, কিন্তু তার সঙ্গে বিশ্বের উপকূলে পৌঁছে যেতে পারে এক অজানা ‘রক্তবীজ’। যে ‘রক্তবীজ’ বিশ্বের কাছে নূতন আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, হরমুজের এই স্থবিরতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পাশাপাশি পৃথিবীর সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি হুঁশিয়ারি হয়ে দাঁড়াতে পারে।