“ঘর ছাড়া, জমি ছাড়া হলে বেঁচে কী লাভ?” – উন্নয়নের নামে মৃত্যুর প্রতিবাদ চলছে ছতরপুর-পান্নায়
১৭ জুলাই,Muthokotha.in: মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর ও পান্না জেলার ঘটনা। এই ঘটনা সম্প্রতি দেশবাসীর নজর কেড়েছে। প্রথমে মনে হবে কোনোও সিনেমার শ্যুটিং চলছে। দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে — কেউ চিতায় শুয়ে আছে। কেউ ক্রুশবিদ্ধ হয়ে আছে। কেউ গলায় ফাঁস লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে ওরা কেউ মরেনি। কিন্তু উচ্চকণ্ঠে বলছে – “এভাবেই মরে যাব।”
কারণটা কী ?
কারণ , ওদের ঘর নেই, ওদের জমি নেই। উন্নয়নের নামে ওদের সবকিছু হারাতে বসেছে। এই সর্বহারা মানুষের দল তাই প্রতিবাদ করতে পথে নেমেছেন।
কিন্তু এরা কারা? কারা এরা? এদের লড়াইটা কীসের?–
এই প্রশ্নটা ওঠা খুব স্বাভাবিক। এরা হলেন মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর ও পান্না জেলার কোল ও গোন্ড আদিবাসী মানুষ। এঁদের প্রতিবাদের ভাষাটাই বদলে দিয়েছেন মহিলারা, এই মহিলারা অতি সাধারণ, খুব সহজ সরল।
লড়াইটা নিতান্ত ব্যক্তিগত নয়, শুধু নিজের বাস্তু বাঁচানোর জন্য এই লড়াই নয়। লড়াইটা বন, নদী, বাঘ, প্রকৃতি বাঁচানোর জন্য।
ভারত সরকারের একটি প্রজেক্ট – ‘কেন-বেতওয়া রিভার লিঙ্ক প্রজেক্ট’ । সরকারি দাবি অনুযায়ী, ১০.৬২ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ, ৬২ লক্ষ মানুষ পাবে পানীয় জল। উপকৃত হবে MP ও UP। অর্থাৎ এই প্রজেক্টের মাধ্যমে প্রভুত উন্নয়ন হবে।
কিন্তু যে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার, সেই উন্নয়নের বদলে কী হারাচ্ছেন ওখানকার মানুষ ?
– জানা গেছে, ২১টি গ্রাম মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।
– ২০ লক্ষেরও বেশি গাছ কাটা পড়বে। ধ্বংস হয়ে যাবে বিস্তীর্ণ বনভূমি।
– পান্না টাইগার রিজার্ভের বড় অংশ শেষ হয়ে যাবে।
– বাঘ, ঘড়িয়াল, শকুন – লুপ্তপ্রায় প্রাণীরা প্রচণ্ড সংকটের মধ্যে পড়বে।
– জলবায়ু, আবহাওয়া, গোটা বাস্তুতন্ত্র বিপন্ন হবে।
আদিবাসীদের অভিযোগ, আগেও সরকার ক্ষতিপূরণ আর পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি সরকার রক্ষা করেনি। তাই এবার আর তাঁরা মানবেন না।
সরকারের কাছে এখন ওদের দাবি একটাই —–—
“ সরকার উন্নয়ন করুক, তারা চায়। কিন্তু আগে মানুষ, গাছ, বন্যপ্রাণীর কথা ভাবুন। সঠিক ক্ষতিপূরণ দিন। পুনর্বাসন দিন। বিকল্প ভাবুন।”
এই মানুষেরা শহরের ফ্ল্যাটে থাকেন না, এঁরা থাকেন প্রকৃতির কোলে। তাই প্রকৃতি নিয়েই বেশি ভাবেন। এরা চায়, পঞ্চায়েত এক্সটেনশন টু সিডিউলড এরিয়াজ অ্যাক্ট, ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট মেনে সিদ্ধান্ত নিক সরকার।
যে আদিবাসীরা , গোন্ড লোকচিত্র এঁকে ভারতীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন , যাঁদের ছবি বড় বড় ফ্ল্যাটের দেওয়ালে সাজানো আছে – আজ তাঁরাই নিজেদের গাছপালা, প্রাণী আর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য প্রাণ দিতে বসেছেন ।
উন্নয়ন তো চাই। সভ্যতার বিকাশ চাই। কিন্তু এইভাবে প্রকৃতিকে হত্যা করে উন্নয়ন চাই না । প্রকৃতি কিন্তু এর বদলা নেবে। তাই বদলা নেওয়ার আগেই আমাদের ভাবতে হবে। নাহলে একদিন সব শেষ হয়ে যাবে, হয়তো সেই দিন খুব বেশি দূরে নয়।