২০ জুলাই, কলকাতা, muthokotha.in: এবার রাজ্যের প্রশাসনিক কাজ থেকে শুরু করে নাগরিক পরিষেবা, ওয়েবসাইট, ফর্ম – সব জায়গায় বাধ্যতামূলক হচ্ছে বাংলা ভাষার ব্যবহার। আগামী ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্তরে সর্বত্র বাংলা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কথা ঘোষণা করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
সোমবার বিধানসভায় ভাষণে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে রাজ্য প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে”।
তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যে ৩ দিনের সফরে এসে তাঁকে একটি চিঠি লিখে রাজ্য প্রশাসনে বাংলা ভাষার ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই চিঠি বিধানসভায় পড়ে শোনানোর পরই মুখ্যমন্ত্রী এই ঘোষণা করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “আমাদের সরকারের সমস্ত কাজে বাংলাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এর জন্য দেড় মাস সময় লাগবে সবকিছু অনুবাদ করতে। সরকার সেই কাজ করবে”।
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলিতে:–
১. নাগরিক পরিষেবা: সমস্ত সরকারি ফর্ম, শংসাপত্র, আবেদনপত্র
২. ডিজিটাল পরিষেবা: সরকারি পোর্টাল, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ডিজিটাল গভর্নেন্স সিস্টেম
৪. প্রশাসনিক কাজ: দফতরের চিঠি, বিজ্ঞপ্তি, নোটিফিকেশন
৫. জনসংযোগ: প্রেস রিলিজ, সরকারি বিজ্ঞাপন, প্রশিক্ষণের উপকরণ
৬. জনসাধারণের জন্য: সরকারি সাইনবোর্ড, থানার যোগাযোগ
তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্যের সরকারি চিঠিপত্রের ক্ষেত্রে হিন্দিও ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই প্রক্রিয়া চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় অনুবাদক ও অন্যান্য ব্যবস্থা সরকার করবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলার সংস্কৃতি ও পরিচয়কে রক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ। তিনি বলেন, “বাংলার মাটি, বাংলার জল” – এই মন্ত্রকে সামনে রেখেই সরকার কাজ করছে।
সম্প্রতি রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরই শুভেন্দু অধিকারী সরকার একাধিক সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্কুলে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করা, UCC ও কড়া ধর্মান্তর বিরোধী আইন আনার কথাও তিনি সম্প্রতি জানিয়েছেন।
জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে গিয়ে শপথের পরই তিনি বলেছিলেন, “কবির ভাবনায় বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে”।
এর আগে তৃণমূল সরকারের আমলে স্কুলে ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গান বাধ্যতামূলক ছিল। ২০১৭ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও স্কুলে বাংলা বাধ্যতামূলক বিষয় করার কথা ঘোষণা করেছিলেন।
এখন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভাষা নীতিতে আরও কড়া অবস্থান নিল। শুভেন্দু অধিকারী ৯ মে ২০২৬ থেকে রাজ্যের ৯ম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনিই রাজ্যের প্রথম বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সরকারের আরও দেড় মাস সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে সমস্ত সরকারি নথি, সফটওয়্যার, ফর্ম বাংলায় অনুবাদ করা হবে। অনুবাদে সাহায্যের জন্য দোভাষী নিয়োগ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
এই ঘোষণার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। বাংলা ভাষাপ্রেমীরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এতে চাকরির ক্ষেত্রে বাংলাভাষীদের অগ্রাধিকার বাড়বে।
তবে কিছু সরকারি কর্মী ও ব্যবসায়ী সংগঠন বলছে, আচমকা সবকিছু বাংলায় করতে গেলে প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যা হতে পারে। অনুবাদের মান ও প্রশিক্ষণের দিকেও নজর দিতে হবে।
১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে চলা এই নির্দেশ পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি বড় পদক্ষেপ। ভাষাকে শুধু আবেগ নয়, প্রশাসনের মূল ভিত্তি করে তোলার চেষ্টা করছে নতুন সরকার।
এখন দেখবার বিষয়, দেড় মাসের মধ্যে সরকার কতটা প্রস্তুতি নিতে পারে এবং সাধারণ মানুষ কত সহজে এই নতুন নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন।