১২ আগস্ট, muthokotha.in : বিধানসভায় দাঁড়িয়ে প্রাক্তন বিধায়কদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা বাড়ানোর কথা ঘোষণা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গলায় শোনা গেল দুই প্রাক্তন বাম বিধায়কের ভূয়সী প্রশংসা। দল-মতের উর্ধ্বে উঠে তিনি তুলে ধরলেন সাধারণ জীবনযাপনের দুই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দীনবন্ধু মণ্ডল ও সুভাষ নস্করের কথা।
এদিন বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, রাজ্যের প্রাক্তন বিধায়কদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা ৬ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করা হচ্ছে। আগস্ট মাস থেকেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বলে তিনি জানান। তবে এর জন্য বিধানসভায় আইন সংশোধন করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
ঘোষণার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়েই তিনি বলেন, “অনেক প্রাক্তন বিধায়কই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তাঁদের শেষ বয়সের দিকে তাকিয়ে সরকারের যে দায়িত্ব ছিল, তা আগের সরকারগুলি সেভাবে পালন করেনি।”
মুখ্যমন্ত্রীর কথায় প্রথমে উঠে আসে অবিভক্ত মেদিনীপুরের মহিষাদল কেন্দ্রের প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক দীনবন্ধু মণ্ডলের নাম।
তিনি বলেন “আমার নিজের চোখে দেখা মানুষ। ৮৪ বছর বয়সেও দীনবন্ধুবাবু এখনও প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে বাজার করেন। বাজার থেকে নিজে আনাজ কিনে আনেন। এলাকার চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে গল্প করেন, চা খান। বিধায়ক ছিলেন, কিন্তু সেই জৌলুস তাঁর গায়ে লাগেনি,” বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
১৯৮২ সালে মহিষাদল থেকে সিপিএমের টিকিটে প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক দীনবন্ধুবাবু। আজও মহিষাদলের মানুষ তাঁকে হেঁটে বা সাইকেলে ঘুরতে দেখেই অভ্যস্ত , যা সাধারণ মানুষের মনে দাগ রেখে যায়।
দ্বিতীয় নামটি হলো বাসন্তীর প্রাক্তন আরএসপি বিধায়ক সুভাষ নস্কর। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওর প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
“ভিডিওতে দেখলাম বাসন্তীর প্রাক্তন বিধায়ক সুভাষদা স্টেশনে বসে আছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কি রোজ এখানে আসেন? তিনি হাসিমুখে বললেন, হ্যাঁ আসি। বাজার করি, খবরের কাগজ পড়ি, এক কাপ চা খেয়ে বাড়ি ফিরে যাই।”
টানা ৭ বার বাসন্তী থেকে আরএসপির টিকিটে জয়ী হয়েছিলেন সুভাষ নস্কর। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্ত্রিসভায় তিনি দীর্ঘদিন সেচমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন। মন্ত্রীত্বের পরেও তাঁর জীবনযাত্রায় কোনও পরিবর্তন আসেনি।
দুই প্রাক্তন বিধায়কের জীবনচিত্র তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই ছবিগুলো দেখার পর মনে হয়েছে বর্ষীয়ান প্রাক্তন জনপ্রতিনিধিদের প্রতি রাজ্য সরকারের কিছু কর্তব্য থেকে যায়। তাঁরা রাজ্যের জন্য কাজ করেছেন, তাই শেষ বেলায় তাঁদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা জানি রাজ্যের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো নয়। সাধ আছে, কিন্তু সাধ্য সীমিত। তবুও সিদ্ধান্ত নিয়েছি প্রাক্তন বিধায়কদের চিকিৎসা ভাতা ৬ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করা হবে।”
শুভেন্দু অধিকারী নিজে একসময় তৃণমূলের নেতা, পরে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। আর তিনি প্রশংসা করলেন দুই কট্টর বাম নেতার। এই ঘটনা বিধানসভায় বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি করল। তৃণমূল ও বিজেপি বিধায়করা টেবিল চাপড়ে এই ঘোষণাকে স্বাগত জানান। বিরোধী সিপিএম ও কংগ্রেসও এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সওয়াল করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “এটি শুধু ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা নয়। এটি হলো রাজনীতিতে সততা ও সারল্যের মূল্যকে স্বীকৃতি দেওয়া। মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন পদ চলে গেলেও জনসেবার আদর্শ থেকে সরে না গেলে মানুষ আজও তাঁকে মনে রাখে।”
দীনবন্ধু মণ্ডল ৮৪ বছরের প্রাক্তন শিক্ষক। ১৯৮২ সালে মহিষাদল থেকে বিধায়ক হন। এখনও সাইকেলই তাঁর প্রধান বাহন। দলীয় পরিচয়ের বাইরে তিনি এলাকার “দীনুবাবু”।
সুভাষ নস্কর বাসন্তীর ৭ বারের বিধায়ক। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে সেচমন্ত্রী ছিলেন। মন্ত্রী থাকাকালীনও ট্রেনে-বাসে যাতায়াত করতেন। এখন ৭০-এর কোঠায় পৌঁছেও স্টেশনে বসে খবরের কাগজ পড়া তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। বিধানসভার বিলাসবহুল পরিবেশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী যখন স্টেশনের বেঞ্চ আর চায়ের দোকানের কথা বললেন, তখন গোটা সভাঘর কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়ে গিয়েছিল।
১০ হাজার টাকা ভাতা হয়তো বড় অঙ্ক নয়। কিন্তু এই ঘোষণার মধ্যে দিয়ে সরকার যে বার্তা দিল তা হল – ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সততা স্থায়ী। দীনবন্ধু মণ্ডল আর সুভাষ নস্কর প্রমাণ করলেন, জনপ্রতিনিধি হতে গেলে বড় গাড়ি, বড় বাড়ি লাগে না। লাগে বড় মন। আর সেই মনের জন্যই আজ তাঁরা বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর মুখে প্রশংসিত হলেন।
অনেকেই বলছেন বাম আমলের বেশীরভাগ বিধায়ক কিংবা মন্ত্রী প্রকৃত সততার সহজ সরল সাধারণ জীবনযাপন করেছেন।