নিজস্ব প্রতিনিধি,২০ জুলাই, পশ্চিম মেদিনীপুর: “হর হর মহাদেব” ধ্বনির বদলে আজ কান্নার রোল ভেসে আসছে সুবর্ণরেখার আকাশে। শ্রাবণ মাসের প্রথম সোমবার বাবার মাথায় জল ঢালতে গিয়ে প্রাণ গেল ১৫ বছরের এক তরুণীর। অভিযোগ, অবৈধ বালি খাদানের কারণে সৃষ্ট চোরাবালিতে আটকে মৃত্যু হয়েছে ওই তরুণীর।
এই ঘটনার পেছনে দায়ী কে? দোষ কার ? প্রশাসনের, বালি মাফিয়ার, নাকি সবার? উত্তর খুঁজছে পশ্চিম মেদিনীপুরের দক্ষিণ বগুড়া সহ সুবর্ণরেখা।
প্রিয়াঙ্কা রায়ের বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের দক্ষিণ বগুড়া এলাকায়। শ্রাবণ মাসে বাবা মহাদেবের ভক্তদের রীতি মেনে রবিবার ভোর রাতে সুবর্ণরেখা নদী থেকে জল আনতে গিয়েছিল মেয়েটি। গন্তব্য ছিল সুবর্ণরেখার পাড়েই অবস্থিত রামেশ্বর মন্দির। প্রতি শ্রাবণে হাজার হাজার ভক্ত এই নদীর জল নিয়ে শিবের মাথায় ঢালেন। কিন্তু কে জানতো বালির নীচে লুকিয়ে আছে মৃত্যু ফাঁদ!
নদীতে নামার সাথে সাথেই চোরাবালিতে আটকে যায় প্রিয়াঙ্কা। স্থানীয়রা উদ্ধার করার আগেই তলিয়ে যায় সে। ভোর রাতের আঁধার তখন যেন অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার।
প্রিয়াঙ্কার বাবা দিলীপ রায়ের অভিযোগ, “অবৈধ বালি খাদানের গর্তেই আমার মেয়ে পড়ে গেছে। এর দায় কে নেবে?”
প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ – সবাই জানেন সুবর্ণরেখার দু’পাড় জুড়ে চলছে বেপরোয়া বালি তোলা। এর ফল? নদীর বুকে জায়গায় জায়গায় তৈরি হয়েছে গভীর গভীর গর্ত আর চোরাবালি।
রামেশ্বর মন্দিরের পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে সুবর্ণরেখা। প্রতি বছর শ্রাবণে লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই ঘাট দিয়েই জল নেন। অথচ আজও নদীর পাড়ে একটা নির্দিষ্ট, নিরাপদ ঘাট করা হল না। বছরের পর বছর দাবি জানিয়েছেন ভক্তরা, কোনো লাভ হয়নি।
স্থানীয়রা বলেন—“এত বড় নদী, মন্দিরে যাওয়ার রাস্তার দু’পাশে ২-৩ মাস বালি তোলা কী বন্ধ রাখা যায় না? কিন্তু সেটা তো হবে না। বালি তো তুলতেই হবে। তুলতেই যখন হবে তখন প্রশাসন কেন সতর্ক করেন না? কেন এই বিশেষ দিনে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয় না? প্রতি শ্রাবণে এই নদী থেকেই জল তোলা হয়। কিন্তু কোন জায়গা নিরাপদ, কোনটা বিপজ্জনক – তা জানার কোনো উপায় নেই। “
সাধারণ মানুষ দাবি তুলেছেন, একটা সেভ জোন চিহ্নিত করা হোক, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে না।
প্রশাসন থেকে নদীর একটি নির্দিষ্ট অংশ চিহ্নিত করে দেওয়া হোক যেখান থেকে নিরাপদে জল তোলা যাবে।
অস্থায়ী ঘাট ও পুলিশ-সিভিক ভলান্টিয়ার মোতায়েন করে- শ্রাবণ মাসে নদীর পাড়ে নজরদারি বাড়ালে এই ঘটনা এড়ানো যেত বলেও অনেকে মনে করছেন। এছাড়াও
মন্দির সংলগ্ন এলাকায় বালি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
কী নির্মম পরিহাস, একটি ১৫ বছরের মেয়ের প্রাণ চলে গেল। কিন্তু দায় নেওয়ার কেউ নেই। প্রশাসন জানে চোরাবালির কথা। স্থানীয়রা জানে বালি মাফিয়ার দৌরাত্ম্যের কথা। তবু প্রতি বছর শ্রাবণ এলেই একই ছবি দেখতে পাওয়া যায়।
প্রিয়াঙ্কার মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়। এটা প্রশাসনিক উদাসীনতা আর বালি মাফিয়াদের লোভের বলি।