শতবর্ষে পা দিয়েও চশমা ছাড়া খবরের কাগজ, হাসিমুখে ইতিহাস শোনান পটাশপুরের প্রাণকৃষ্ণ, জন্মদিনে চার প্রজন্মের আবেগঘন মিলনমেলা
নিজস্ব প্রতিনিধি, পটাশপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, ৭ জুলাই ২০২৬: বয়স যে নিছকই সংখ্যা, তা আরও একবার প্রমাণ করলেন পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর দুই ব্লকের পানিয়া সারদাবাড় গ্রামের বাসিন্দা প্রাণকৃষ্ণ দাস। সোমবার ১০০ বছরে পা দিলেন তিনি। অবাক করার বিষয়, এই বয়সেও চোখে চশমার দরকার পড়ে না, কানেও খাটো নন। নিজের হাতে খাওয়া-দাওয়া, স্নান, পোশাক পরা থেকে শুরু করে টুকটাক হাঁটাচলা— সব কাজই করেন নিজে। স্মৃতিশক্তি এখনও টনটনে, গড়গড় করে বলে যান ব্রিটিশ আমল থেকে ডিজিটাল যুগের গল্প। সোমবার চার প্রজন্মের ৪০ জনের বেশি সদস্যের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হল তাঁর শতবর্ষের জন্মদিন।
এক শতকের জীবন্ত দলিল প্রাণকৃষ্ণ:—
১৯২৬ সালের ৬ জুলাই জন্ম প্রাণকৃষ্ণ দাসের। পরাধীন ভারতের শেষ দশক, স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল সময়, দেশভাগের যন্ত্রণা, একাধিক যুদ্ধ, সবুজ বিপ্লব থেকে মোবাইল-ইন্টারনেটের যুগ— সব কিছুর প্রত্যক্ষ সাক্ষী তিনি। যৌবনে প্রতাপদিঘির একটি রাইস মিলে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। স্ত্রী প্রয়াত হলেও দুই ছেলে প্রকাশ দাস ও প্রভাত দাস, দুই মেয়ে প্রতিমা রায় ও প্রতিভা দাসকে নিয়ে তাঁর ভরা সংসার। বর্তমানে ৮ নাতি-নাতনি ও ১২ পুতি-পুতনিকে নিয়ে তাঁর চার প্রজন্মের পরিবার। উঠোনে খুদেদের সঙ্গে বসে এখনও দেশভাগের সময়ের পালিয়ে আসার গল্প, স্বাধীনতার দিন গ্রামে পতাকা তোলার স্মৃতি শোনান প্রাণকৃষ্ণ।
বয়স ১০০, তবুও স্বনির্ভর:—
১০০ বছর বয়সেও প্রাণকৃষ্ণবাবুর রুটিন বাঁধা। ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠা, প্রাতঃভ্রমণ, পুজো-আচ্চা সেরে খবরের কাগজে চোখ বোলানো— সবই করেন নিজে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, এখনও চোখে চশমার প্রয়োজন হয়নি তাঁর। চশমা ছাড়াই সকালের খবরের কাগজ পড়েন। কানেও স্পষ্ট শোনেন, জোরে কথা বলার দরকার পড়ে না। যদিও বয়সের ভারে চোখে ও কানে সামান্য সমস্যা হয়েছে বলে পরিবারের দাবি, কিন্তু মনের জোর ও স্মৃতিশক্তি একেবারে টনটনে। গ্রামের পুরনো রাস্তা কোথায় ছিল, কোন পুকুর কবে কাটা হয়েছিল, কে কোথায় থাকত— সব তাঁর নখদর্পণে। এখনও পর্যন্ত স্নান, খাওয়া, পোশাক পরা— কোনও কাজেই কারও সাহায্য নেন না তিনি।
দীর্ঘায়ুর পাঠ দিচ্ছেন শতায়ু প্রৌঢ়:—
“নিয়মমাফিক জীবনযাপনই বাবার সুস্থতার চাবিকাঠি,” বলছেন দুই ছেলে প্রকাশ ও প্রভাত। তাঁদের কথায়, সারা জীবন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন বাবা। এখনও ভোরে ওঠেন, রাত ৯টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। খাবারে বরাবর সাত্ত্বিক ভাব। কম তেল-মশলা, শাক-সবজি, ডাল-ভাতই পছন্দ। দুশ্চিন্তাকে কোনওদিন কাছে ঘেঁষতে দেননি। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, অল্পে খুশি থাকাই তাঁর মন্ত্র।
বড়ো মেয়ে প্রতিমা রায় বলেন, “বাবা কোনওদিন কারও সঙ্গে ঝগড়া করেননি। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে ভালবাসেন। এই মনের জোরই বাবাকে ১০০ বছর বাঁচিয়ে রেখেছে। বাবা বলেন, রাগলে আয়ু কমে।” ছোট মেয়ে প্রতিভা দাসের গলাতেও একই সুর, “১০০ বছর বয়সে এত ফিট মানুষ আমরা দেখিনি। বাবা আমাদের কাছে জীবন্ত ইতিহাস। নতুন প্রজন্ম ওঁকে দেখে শিখুক কীভাবে সুস্থভাবে বাঁচতে হয়, কীভাবে সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে হয়।”
জন্মদিনে চাঁদের হাট, আবেগে ভাসল পরিবার:–
সোমবার সকাল থেকেই পানিয়া সারদাবাড়ের দাস বাড়িতে সাজো সাজো রব। কলকাতা, হলদিয়া, কাঁথি , এগরা থেকে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি, তাদের ছেলেমেয়েরা— সবাই হাজির। বাড়ির উঠোনে বেলুন, ফুল দিয়ে সাজানো মঞ্চে ১০০ লেখা কেক কাটলেন প্রাণকৃষ্ণ। নিজের হাতে নাতি-পুতিদের পায়েস খাওয়ালেন। দিনভর চলল গান, পুরনো দিনের কবিতা পাঠ, আর দাদু-ঠাকুরদার মুখে গল্প শোনার আসর।
বাড়ির প্রবীণ থেকে নবীন— সকলেই এসেছিলেন প্রাণকৃষ্ণবাবুকে প্রণাম জানাতে, আশীর্বাদ নিতে। এক প্রতিবেশী বলেন, “কাকু আমাদের গ্রামের অভিভাবক। বিপদে-আপদে এখনও পরামর্শ দেন।” প্রতিমা দেবীর মেয়ে তথা প্রাণকৃষ্ণবাবুর নাতনি সোমা রায় মাইতি (হাইস্কুলের গণিতের শিক্ষিকা ) বলেন, “দাদু আমাদের আস্ত একটা গল্পের বই। দাদুর মুখে দেশভাগের সময় হাজার হাজার মানুষের ট্রেনে করে পালিয়ে আসার গল্প, ইংরেজ ভারত ছাড়ো স্লোগানে উত্তাল হয়ে মিছিলে হাঁটার গল্প, স্বাধীনতার দিন গ্রামে প্রথমবার তেরঙা ওড়ানোর গল্প শুনি। দাদুই আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।”
গ্রামের গর্ব, প্রাণকৃষ্ণ:—
এলাকার মানুষজনের কথায়, প্রাণকৃষ্ণ দাস শুধু একটি পরিবারের নন, গোটা পটাশপুরের গর্ব। নাত জামাই তথা কবি ও শিক্ষক মানস কুমার মাইতি বলেন “এত সুস্থ শতায়ু মানুষ সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। ওঁর জীবনযাপন নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষণীয়। তাঁর সুস্থ জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে পরিবারের এই ‘শতায়ু সম্মান’ নব দিগন্তের নতুন সূর্যোদয়!”
এক শতক পেরিয়েও অদম্য প্রাণশক্তি, হাসিমুখ আর শৃঙ্খলাবোধ দিয়ে প্রাণকৃষ্ণ দাস বুঝিয়ে দিলেন— বয়সকে হারাতে পারে শুধু ইচ্ছাশক্তি, ইতিবাচক মনোভাব আর নিয়মানুবর্তিতা।