মানবিকতার উৎসব জন্মদিনেও : আড়ম্বর নয়, সেবাই ব্রত উজ্জয়িনী ব্যানার্জির
এগরা,৭ আগস্ট ,পূর্ব মেদিনীপুর, muthokotha.in: জন্মদিন মানেই কেক কাটা, রঙিন বেলুন, বন্ধুদের আড্ডা আর পেটপুরে খাওয়া-দাওয়া। এই চিরাচরিত ছবিটাই আমাদের চোখে ভাসে। কিন্তু সেই গণ্ডি ভেঙে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন পূর্ব মেদিনীপুরের এগরার মেয়ে, সমাজসেবী সংগঠন ‘উই কেয়ার ফাউন্ডেশন’-এর কর্ণধার উজ্জয়িনী ব্যানার্জি। নিজের জন্মদিনে কোনও জাঁকজমক নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই হয়ে উঠল তাঁর উদযাপনের ভাষা।
প্রতিদিনের মতো এদিনও নিজেকে সামাজিক কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখলেন উজ্জয়িনী। তাঁর কাছে জন্মদিন মানে শুধু নিজের জন্য একটা দিন নয়, বরং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও একবার ঝালাই করে নেওয়ার দিন। সেই বার্তাই তিনি দিলেন হাতে ফল, হরলিক্স, শাড়ি ও ধুতি তুলে দিয়ে।
শুক্রবার ছিল উজ্জয়িনী ব্যানার্জির জন্মদিন। সকাল থেকেই শুভেচ্ছার বন্যা। কিন্তু উজ্জয়িনী সেসবের মাঝে সময় বের করে পৌঁছে গেলেন এগরা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রান্তিক পরিবারগুলির কাছে। তাঁর হাতে ছিল বয়স্ক ও অসহায় মানুষদের জন্য নতুন শাড়ি ও ধুতি। ছোট শিশু ও দুর্বল মানুষদের জন্য পুষ্টিকর ফল ও হরলিক্সের প্যাকেট।
এলাকার এক বৃদ্ধা, যিনি শাড়ি হাতে পেয়ে কেঁদে ফেলে বলেন, “মা, জন্মদিনে কেউ এমন উপহার দেয়? ভগবান তোমার ভালো করুক।”
উজ্জয়িনী বলেন, “আমি বিশ্বাস করি জন্মদিনে নিজের আনন্দের থেকেও বড় আনন্দ হল অন্যের মুখে হাসি দেখা। আমরা রোজই চেষ্টা করি মানুষের পাশে থাকতে। আজকের দিনটা তারই একটা অংশ। আড়ম্বর করে টাকা খরচ না করে, সেই টাকায় যদি ১০টা মানুষের উপকার হয়, সেটাই আমার কাছে আসল উপহার।”
‘উই কেয়ার ফাউন্ডেশন’ বিগত কয়েক বছর ধরেই পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন প্রান্তে নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে। রক্তদান শিবির, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শীতবস্ত্র বিতরণ, বন্যা দুর্গতদের ত্রাণ থেকে শুরু করে দুঃস্থ ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার সরঞ্জাম দেওয়া – সবেতেই রয়েছে এই সংগঠনের সক্রিয় ভূমিকা।
আর এই পুরো দলের হাল ধরে রয়েছেন উজ্জয়িনী ব্যানার্জি। পেশায় তিনি একজন শিক্ষিকা, কিন্তু মনেপ্রাণে একজন সমাজকর্মী। তাঁর কথায়, “প্রতিদিন নিজেকে যেমন সামাজিক কাজে জড়িয়ে রাখি, বিকল্প হলো তার নিজের জন্মদিনেও। জন্মদিনটা যদি মানুষের কাজে লাগে, তাহলে তার থেকে বড় পাওনা আর কী হতে পারে?”
দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক কর্মকাণ্ডে উজ্জ্বয়িনী ও তাঁর সংস্থা আপোষহীন লড়াই করে চলেছেন। করোনা কাল থেকে শুরু করে আমফান, যশ , বন্যা– প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ‘উই কেয়ার’ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। লকডাউনে কর্মহীন মানুষের বাড়ি বাড়ি খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে কোভিড আক্রান্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, সবই করেছে এই ফাউন্ডেশন। আর সবেতেই উজ্জয়িনী নিজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
আমাদের কাছে জন্মদিন মানেই রেস্তোরাঁ, পার্টি, দামি উপহার আর হৈচৈ-এর এক পরিচিত ছবি। কিন্তু উজ্জ্বয়িনী এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে যে বার্তা দিলেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, উদযাপন অনেক রকমের হতে পারে। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে একটু ভালোবাসা, একটু সহযোগিতা দেওয়ার মধ্য দিয়েও জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখা যায়।
এদিনের কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন ফাউন্ডেশনের অন্যান্য সদস্যরাও। তাঁরা প্রত্যেকেই উজ্জয়িনীর এই ভাবনাকে সাধুবাদ জানান। সংগঠনের সদস্যরা বলেন, “দিদির কাছ থেকেই আমরা শিখেছি কীভাবে মানুষের পাশে থাকতে হয়। ওঁর জন্মদিনে আমরাও ওঁর সঙ্গে এই কাজে সামিল হতে পেরে গর্বিত।”
স্থানীয় বাসিন্দারাও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, রাজনীতি বা প্রচারের বাইরে গিয়ে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া মানুষ আজ বিরল। উজ্জয়িনী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। কাজ পাগল এই মানুষটি রাতদিন এক করে মানুষের জন্য কাজ করে যান।
উজ্জয়িনী জানান, জন্মদিনের এই উপহার বিতরণ শুধু একদিনের জন্য নয়। বিগত দিনেও তিনি এই কাজ করেছেন, আগামী দিনেও ‘উই কেয়ার ফাউন্ডেশন’ এগরা ও তার আশেপাশের এলাকায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিয়ে আরও বড় প্রকল্প নিয়ে আসবে। বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের ক্ষমতায়নের উপর জোর দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “আমার একার পক্ষে সব করা সম্ভব নয়। কিন্তু যদি আরও ১০ জন মানুষ আমার এই কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের জন্মদিন বা অন্য কোনও বিশেষ দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তাহলেই আমার এই প্রয়াস সার্থক হবে। আমাদের সংস্থার সদস্য-সদস্যারা আপোষহীন লড়াই করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা সবসময়ের করে থাকেন।”
উজ্জয়িনীর এই উদ্যোগ শুধু এগরার মানুষের কাছেই নয়, গোটা জেলার কাছে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। জন্মদিন পালনের সংজ্ঞাটাই যেন বদলে দিলেন তিনি। প্রমাণ করলেন, দামি কেক নয়, একটা শাড়ি বা এক প্যাকেট হরলিক্সও কারও জীবনে অনেক বড় উপহার হতে পারে।