নিজস্ব প্রতিনিধি, ১০ জুলাই ২০২৬, বেঙ্গালুরু, কর্ণাটক: প্রকৃতিকে ভালোবাসলে প্রকৃতিও একদিন সুদে-আসলে ফিরিয়ে দেয়। তার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে রইলেন বেঙ্গালুর ৮৫ বছরের বৃদ্ধ এনজি কেশরী। প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে যেখানে গাছ ভেঙে মানুষের ক্ষতি হয়, সেখানে তাঁর জীবনে ঝড় ডেকে আনল সৌভাগ্য। ৪০ বছর ধরে আগলে রাখা একটি চন্দন গাছ ভেঙে পড়তেই তিনি পেলেন ২৮ লক্ষ টাকা এবং রাজ্য সরকারের বিরল “স্যান্ডালউড শিরোমণি” সম্মান।
ঘটনার সূত্রপাত : ৪০ বছর আগের একটা চারা
ঘটনাটি বেঙ্গালুর বাসিন্দা এনজি কেশরীর। আজ তাঁর বয়স ৮৫। সময়টা ছিল প্রায় ৪০ বছর আগে। তখন তাঁর বয়স ৪৫। নিজের বাড়ির বাগানে হঠাৎ করেই একটি চারা গজিয়ে ওঠে। প্রকৃতির নিয়মে বীজ উড়ে এসে মাটিতে পড়ে অনেক সময়ই এমন চারা হয়। বেশিরভাগ মানুষই একে আগাছা ভেবে উপড়ে ফেলেন।
কিন্তু কেশরী তা করেননি। তিনি ভাবলেন, “বেঁচে থাকতে চাইছে যখন, বড় হতে দিই।” সেই ছোট্ট চারাটিকে তিনি নিয়মিত জল দিতেন, পরিচর্যা করতেন। প্রথমে তিনি নিজেও জানতেন না গাছটি কীসের।
জানতে পারলেন এটা “সবুজ সোনা”
কিছু বছর পর গাছটি একটু বড় হতেই বোঝা গেল এটি একটি চন্দন গাছ। চন্দন মানে শুধু সুগন্ধ নয়, এটি “সবুজ সোনা”। এর কাঠের দাম আকাশছোঁয়া। আর দামি জিনিস মানেই চোরের নজর।
কেশরীও বুঝলেন বিপদের কথা। রাতের অন্ধকারে কাঠ চোরেরা এই গাছ কেটে নিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি আর ঝুঁকি নেননি। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে গাছটির চারপাশে মোটা লোহার বেড়া দিয়ে দিলেন। তারপর থেকে ৪০ বছর ধরে প্রতিদিনের মতো তিনি গাছটিকে আগলে রেখেছেন। গাছের গায়ে যেন আঁচ না লাগে, সেই নজরদারি চলেছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।
ঝড় হয়ে এল আশীর্বাদ
সম্প্রতি বেঙ্গালুরুতে প্রবল ঝড়বৃষ্টি হয়। ঝড়ের তাণ্ডবে পাশের একটি বড় গাছ ভেঙে সোজা এসে পড়ে কেশরীর সেই ৪০ বছরের চন্দন গাছটির ওপর। প্রবল ধাক্কা সামলাতে না পেরে কেশরীর আদরের চন্দন গাছটিও ভেঙে পড়ে।
অনেকেই হয়তো এই সুযোগে রাতারাতি গাছটি কেটে কালোবাজারে বেচে দেওয়ার কথা ভাবতেন। কিন্তু ৮৫ বছরের বৃদ্ধ কেশরী সততার পথেই হাঁটলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে কর্ণাটক বন দফতরকে ফোন করে খবর দেন। বলেন, “আমার গাছ ভেঙে পড়েছে, আপনারা এসে নিয়ে যান।”
১ টন ওজনের গাছ = ২৮ লক্ষ টাকা
খবর পেয়ে বন দফতরের আধিকারিকরা এসে গাছটি উদ্ধার করেন। মাপার পর দেখা যায় গাছটির ওজন প্রায় ১ মেট্রিক টন। নিয়ম অনুযায়ী চন্দন গাছ সরকারি সম্পত্তি। তাই গাছটি নিয়ে যাওয়া হয় সরকারি চন্দন কাঠ ডিপোয়।
সেখান থেকে গাছটি কিনে নেয় রাজ্য সরকারের সংস্থা “কর্ণাটক সোপস অ্যান্ড ডিটারজেন্টস লিমিটেড”। সরকারি নিয়ম মেনে গাছের দাম বাবদ এনজি কেশরীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে ২৮ লক্ষ টাকা।
মিলল বিরল সম্মান
টাকা পাওয়াই শেষ নয়। ৪০ বছর ধরে একটি সরকারি সম্পত্তি তথা মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখার জন্য কর্ণাটক সরকার কেশরীকে বিশেষভাবে সম্মানিত করে। তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় “স্যান্ডালউড শিরোমণি” উপাধি এবং শংসাপত্র।
আজ কেশরী বলেন, “গাছটা ভেঙে খারাপ লেগেছিল। কিন্তু সরকার যে সম্মান আর মূল্য দিল, তাতে মন ভরে গেছে।
ঝড় অনেক সময় ধ্বংস ডেকে আনে। কিন্তু এনজি কেশরীর জীবনে সেই ঝড়ই হয়ে উঠল আশীর্বাদ।