চাষের কাজের পরে ঘাঘরা নদীর পাড়ে বালক, টেনে নিয়ে গেল কুমীর : চোখের সামনেই প্রাণ গেল বাপ-মা হারা মেধাবী সুনীলের
১৯ জুলাই, http://Muthokotha.in : ক্ষেতের কাজ শেষ করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে নদীর পাড়ে গেল সুনীল। একটু হাত-মুখ ধোয়ার জন্য নদীর পাড়ে গিয়েছিল ১২ বছরের এই বালক। নদীর মধ্যেই ওঁত পেতে অপেক্ষা করছিল ঘাতক। মুহূর্তেই জলের ভেতর থেকে হুড়মুড়িয়ে উঠে এসে তাকে টেনে নিয়ে গেল গভীর জলে। কাকা প্রাণপণে ৭ মিনিট ধরে ভাইপোর হাত ধরে টানলেন , গ্রামবাসীরাও তাড়াতাড়ি ছুটে এলেন । কিন্তু কুমিরের শক্তির কাছে পেরে উঠলো না কেউই।
এর কয়েক ঘণ্টা পর নদী থেকে উদ্ধার হল ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র সুনীল সিং-এর ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। সুনীলের বাড়ি উত্তর প্রদেশের বাহরাইচ জেলার টিকুরি গ্রামে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় শিউরে উঠেছে গোটা দেশ। ভাইরাল হয়েছে একটি গ্রামবাসীদের তোলা একটি ভিডিও।
বাহরাইচের টিকুরি গ্রামের বাসিন্দা সুনীল সিং। বাবা-মা আগেই মারা গিয়েছেন। তিন বোন ও কাকার কাছেই মানুষ হচ্ছিল সে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কাকার সঙ্গে গ্রামের জমিতে ধান গাছের চারা রোপণ করতে গিয়েছিল সুনীল। কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় *ঘাঘরা নদীর* পাড়ে দাঁড়ায় সে। উদ্দেশ্য, হাত-মুখে লেগে থাকা কাদা ধোয়া।
প্রত্যক্ষদর্শী ও গ্রামবাসীদের বয়ান অনুযায়ী, সুনীল নদীর কিনারে বসে হাত ধুচ্ছিল। আচমকাই ঘোলা জলের ভেতর থেকে প্রায় ১০-১২ ফুট লম্বা একটি কুমির লাফিয়ে উঠে সুনীলের পায়ে কামড়ে ধরে। নিমেষের মধ্যে জলের তোড়ে তাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে।
সুনীলের কাকা বিজয় সিং কান্নাভেজা গলায় বলেন, “আমি ওর হাতটা ছাড়িনি। প্রায় সাত মিনিট ধরে জলের ভেতরে ওকে টেনে তোলার চেষ্টা করেছি। চিৎকার করে গ্রামের লোকজনকেও ডাকছিলাম। কিন্তু কুমিরটা এত শক্তিশালী ছিল যে আমি একা পেরে উঠিনি। শেষে ওকে আরও গভীর জলে টেনে নিয়ে চলে গেল। আমি আমার ভাইপোকে বাঁচাতে পারলাম না।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যান্য গ্রামবাসীরাও লাঠি, দড়ি নিয়ে ছুটে আসেন। কিন্তু ঘাঘরা নদীর স্রোত ও কুমিরের তেজের কাছে সকলের চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। সুনীলকে নিয়ে কুমিরটি জলের অনেকটা ভেতরে চলে যায়। ছাড়ানোর আর কোনো উপায় থাকলো না।
কুমির সুনীলকে টেনে নিয়ে যাওয়ার পরই খবর যায় স্থানীয় প্রশাসন ও বন দফতরের কাছে। গ্রামবাসীরাও দীর্ঘক্ষণ নদীতে তল্লাশি চালান। টানা কয়েক ঘণ্টা খোঁজার পর রাত ১০টা নাগাদ নদীর কিছুটা দূরে ভেসে ওঠে সুনীলের ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। এই গোটা ঘটনার একটি ভিডিও মোবাইলে বন্দি করে ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভিডিওতে দেখা যায়, ঘাতক কুমিরটি সুনীলকে নিয়ে জলের মধ্যে টানাটানি করছে এবং গ্রামবাসীরা নদীর পাড় থেকে চিৎকার করছেন। ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। বাহরাইচ পুলিশও এই ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেছে বলে জানিয়েছে।
সুনীল টিকুরি গ্রামের একটি অতি সাধারণ পরিবারের ছেলে। সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। বাবা-মা না থাকার জন্য কাকার কাছে থাকতো এবং সংসারের কাজে কাকাকে সে সহযোগিতা করত। স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি ক্ষেতের কাজকর্মও তাকে করতে হতো।
গ্রামের স্কুলের শিক্ষকরা জানান, “সুনীল খুব শান্ত ও পড়াশোনায় ভালো ছেলে ছিল। তিন বোনের মধ্যে ও-ই একমাত্র ছেলে ছিল। ওর স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে চাকরি করে বোনদের বিয়ে দেওয়া।”
সুনীলের মৃত্যুর খবর পাওয়া মাত্রই গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে । বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। ঘটনার পরেই ঘটনাস্থলে পুলিশ ও বন দফতরের আধিকারিকরা পৌঁছে যায়। সুনীলের মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
বাহরাইচের সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট প্রকাশ সিং বলেন, “এটি একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বন্যপ্রাণীর হামলায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারকে ৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরুও হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, ঘাঘরা নদীতে কুমিরের উপদ্রব নতুন নয়। গ্রামবাসীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নদীর পাড়ে সতর্কীকরণের বোর্ড লাগানো হবে।
বাহরাইচ ও তার আশেপাশের জেলাগুলিতে ঘাঘরা, সরযূ নদীতে কুমিরের হামলার ঘটনা নতুন কিছু নয়। প্রতি বছর বর্ষার সময় এই নদী গুলোর জল বাড়লে কুমিররা লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসে।
বন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে বাহরাইচ জেলায় কুমিরের আক্রমণে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিকার হয়েছে শিশু ও মহিলারা, যারা নদীতে কাপড় কাচতে বা জল আনতে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বন দফতর মাঝে মাঝে কুমির ধরলেও, কিছুদিন পর আবার নতুন কুমির চলে আসে। নদীর পাড়ে পর্যাপ্ত ব্যারিকেড ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেই।
গ্রামের মানুষের একটাই ক্ষোভ, “আমরা আর কত প্রাণ দেব?” সুনীলের মৃত্যুর পর টিকুরি গ্রামে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামবাসীদের দাবি, বারবার প্রশাসনকে জানানো সত্ত্বেও নদীতে কুমির ধরার জন্য কোনও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁরা বলেন, “এই নদীই আমাদের জীবিকা। ধান চাষের জল এখান থেকেই আসে। কিন্তু এখন নদীতে যেতে ভয় লাগে। প্রশাসন যদি এখনই কুমির না ধরে, তাহলে আরও সুনীলের প্রাণ যাবে।”
হৃদয়ের চড়াই উতরাই পেরিয়ে একটি প্রাণ, তিনটি বোন ও একরাশ কথা থেকে গেল —- সুনীল চলে গেল। সে রেখে গেল তিন অবুঝ বোনকে। তার কাকা বিজয় সিং আজও রাতে ঘুমাতে পারেন না। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে ভাইপোর হাতটা ধরে রাখার সেই ৭ মিনিটের অসহায় লড়াই ও ব্যর্থতার ছবি।