Muthokotha.in, ১৬ অগস্ট ২০২৬: আকাশপথে সফর মানেই সাধারণত নিরাপদ যাত্রা, সময়ের সাশ্রয় এবং উন্নত পরিষেবার নিশ্চয়তা। কিন্তু মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো বা ডিআরসি-র ক্ষেত্রে এই ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এখানে প্লেনে চড়া মানে প্রতিটি মুহূর্তে অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই।
ডিআর কঙ্গোর বিমান সংস্থাগুলির হাতে থাকা বিমানগুলো দেখলে মনে হবে যেন যুগ যুগ ধরে একই যান চলছে। গায়ের রং চটে গেছে, জায়গায় জায়গায় মরচে। ভিতরের আসন, লাগেজ রাখার তাক – কোনও কিছুরই ঠিকঠাক রক্ষণাবেক্ষণ নেই।
বিমানে ওঠা-নামার জন্যও প্রয়োজনীয় সিঁড়ির ব্যবস্থা অনেক সময় থাকে না। যাত্রীদেরই নিজেদের ব্যাগপত্র বিমানের ছাদের উপর দড়ি দিয়ে বেঁধে নিতে হয়। পরিস্থিতি এমন যে আকাশপথের বদলে মনে হয় পাড়ার রুটের বাসে চড়ছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিয়োতে দেখা গেছে, উড়ানের সময় কেবিনের মধ্যে ছাগল-ভেড়া ঘোরাফেরা করছে। অনেকে কোলে পোষা প্রাণী নিয়ে বসে আছেন। লাগেজ রাখার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় সবকিছুই হ-য-ব-র-ল।
শুধু বিমান নয়, কঙ্গোর বিমানবন্দরগুলির হালও একই। আধুনিক স্ক্যানার, চেকিং কাউন্টার বা জরুরি পরিষেবার ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত। কর্মীদের মধ্যে দায়িত্ববোধের অভাব স্পষ্ট। কাজে গড়িমসি, সময়ে ডিউটিতে না আসা – এগুলোই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিচু স্তর থেকে ওপর স্তর পর্যন্ত প্রতিটি দফতরে উদাসীনতা। বিমান ও বিমানবন্দরের বেহাল দশা দেখে কর্মীদেরও কাজের আগ্রহ কমে গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ‘দ্য অ্যাভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্ক’ ২০১৯ সালে যে তথ্য প্রকাশ করেছিল, তাতে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে বিশ্বে যত বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে কঙ্গো রয়েছে ৬ নম্বরে। আর প্রাণহানির সংখ্যার বিচারে ৪ নম্বরে।
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হল, বিশ্বের মোট আকাশপথের ট্রাফিকের মাত্র ১ শতাংশ কঙ্গোর দখলে। অর্থাৎ খুব কম সংখ্যক উড়ান থাকা সত্ত্বেও দুর্ঘটনার হার আকাশছোঁয়া।
কঙ্গো দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কখনও গৃহযুদ্ধ, কখনও উপজাতিদের মধ্যে সংঘর্ষ। তার উপর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইবোলা ভাইরাসের দাপট দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও পিছিয়ে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিমান পরিষেবায় বিনিয়োগ বা আধুনিকীকরণের কথা ভাবা বিলাসিতা। ফলে পুরনো, ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলোই বারবার মেরামত করে চালানো হচ্ছে।
দুর্ঘটনা ও বিপুল ঋণের চাপে দেশের প্রধান বিমান সংস্থা ‘কঙ্গো এয়ারওয়েজ়’ বর্তমানে তাদের সমস্ত উড়ান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। যাত্রী নিরাপত্তা এবং আর্থিক কারণ – দুটোই এর পিছনে রয়েছে। তবে আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন সংস্থা ‘এয়ার কঙ্গো’। একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে তারা যাত্রা শুরু করেছে। আপাতত মাত্র দুটি বিমান দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে পরিষেবা দিচ্ছে তারা।
আগের বিমানগুলির তুলনায় এগুলোর অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো। কিন্তু আন্তর্জাতিক মান থেকে এখনও অনেক দূরে। নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও পরিষেবার দিক থেকে উন্নতির প্রচুর সুযোগ রয়েছে।
ইবোলা সংক্রমণের ভয়ে বর্তমানে কঙ্গোর কোনও বিমানকেই আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
ভাইরাসের প্রকোপ কমলেও কঙ্গোর বিমান শিল্প কবে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ শুধু রোগ নয়, দেশের সামগ্রিক পরিকাঠামো, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগের অভাবও বড় সমস্যা।
কঙ্গোর কিছু যাত্রী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, _“টিকিট কাটার সময় ভাবি সময় বাঁচবে। কিন্তু প্লেনে উঠে মনে হয় জীবনটাই ঝুঁকিতে। সিটবেল্ট ঠিকমতো কাজ করে না, ইঞ্জিন থেকে আওয়াজ আসে। ব্যাগ রাখার জায়গা নেই। ছাদের উপর নিজেই দড়ি দিয়ে বাঁধতে হয়। পাশের সিটে কেউ ছাগল নিয়ে বসে থাকলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।”
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, কঙ্গোর মতো দেশে বিমান পরিষেবা শুধুমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম নয়, জরুরি ওষুধ, খাবার ও ত্রাণ পৌঁছানোর অন্যতম উপায়। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে সেই কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
তাঁদের পরামর্শ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশগুলির সহযোগিতায় কঙ্গোর বিমানবন্দর ও বিমানগুলোকে নতুন করে গড়ে তোলা দরকার। প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সময় বাঁচানোর জন্য মানুষ যে মাধ্যমকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে, ডিআর কঙ্গোতে সেটাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বিপজ্জনক। জরাজীর্ণ বিমান, ভেঙে পড়া বিমানবন্দর, শূন্য নিরাপত্তা এবং ক্রমাগত দুর্ঘটনা— সব মিলিয়ে কঙ্গোর আকাশপথ আজ গোটা বিশ্বের কাছে একটি বড় উদাহরণ।
‘এয়ার কঙ্গো’র হাত ধরে নতুন শুরু হলেও, পুরনো ক্ষত সারতে এখনও অনেক পথ বাকি। ইবোলা পরবর্তী সময়ে কঙ্গো যদি আন্তর্জাতিক স্তরে ফিরতেও চায়, তাহলে প্রথমেই নজর দিতে হবে মানুষের জীবনের নিরাপত্তার দিকে। নাহলে আকাশপথের বদলে কঙ্গোবাসীর কাছে আকাশই থেকে যাবে আতঙ্কের আরেক নাম।