স্বাধীনতা দিবসে সমাজসেবার অনন্য নজির কালিপদ ভূঞ্যার
মানস কুমার মাইতি, ১৫ আগস্ট, এগরা, muthokotha.in : তিনি দেশের সীমান্তে বন্দুক হাতে দেশরক্ষার গুরুদায়িত্ব পালন করেন। আর নিজের গ্রামে ফিরে ছাত্রছাত্রীদের মুখে হাসি ফোটাতে পছন্দ করেন। পটাশপুর-২ ব্লকের শ্রীরামপুর গ্রামের বাসিন্দা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সৈনিক কালিপদ ভূঞ্যা গত ১৫ বছর ধরে ঠিক এভাবেই স্বাধীনতা দিবসকে স্মরণীয় করে তুলছেন, যা ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের মনে দাগ কেটেছে।
দেশসেবার পাশাপাশি সমাজসেবাতেও তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সেনাবাহিনীর কঠোর দায়িত্ব সামলেও প্রতি বছর ১৫ আগস্ট ব্যক্তিগত উদ্যোগে এলাকার চারটি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য জল, টিফিন, মঞ্চ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তিনি। তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজে গর্বিত গোটা শ্রীরামপুর।
জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে প্রতি স্বাধীনতা দিবসে কালিপদ ভূঞ্যা শ্রীরামপুর গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় চারটি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। দূরে কর্মরত থাকলেও এই একটি দিনের জন্য তিনি ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
গ্রীষ্মের রোদে দীর্ঘক্ষণ ধরে পতাকা উত্তোলন, প্যারেড ও জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। তাই প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর জন্য তিনি নিজে খরচ করে ঠান্ডা জলের বোতল এবং টিফিনের প্যাকেটের ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে করার জন্য তিনি নিজ উদ্যোগে ও খরচে মঞ্চ বাঁধারও ব্যবস্থা করেন। মাইক, চেয়ার, প্যান্ডেল – সব কিছুর দায়িত্ব তাঁর। খাওয়া-দাওয়ার দায়িত্বের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের দেশাত্মবোধক গান, নাচ, আবৃত্তির মঞ্চও করে দেন। যাতে শিশুরা স্বাধীনতার মাহাত্ম্য বুঝতে পারে।
স্থানীয় শ্রীরামপুর হরপ্রসাদ হাইস্কুলের শিক্ষক দেবাশিস জানা বলেন, “আমরা শুধু অনুষ্ঠান করি। বাকি সব দায়িত্ব কালিপদবাবু নেন। উনি না থাকলে এত বড় করে অনুষ্ঠান করা সম্ভব হত না।”
ডিউটির ফাঁকে ফোনে যোগাযোগ করা হলে কালিপদ ভূঞ্যা বলেন, “আমি দেশের জন্য লড়ি। কিন্তু দেশ তো গ্রাম দিয়েই তৈরি। গ্রামের ছেলেমেয়েরা যদি ভালোভাবে বড় না হয়, তাহলে দেশ এগোবে কী করে? স্বাধীনতা দিবস মানে শুধু ছুটি নয়, এটা নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম শেখানোর দিন। তাই যতদিন পারব এই কাজ করে যাব।”
তিনি আরও জানান, সেনাবাহিনীতে কাজ করার সময় যে সামান্য বেতন পান, তার একটা অংশ তিনি প্রতি বছর এই কাজের জন্য জমিয়ে রাখেন। কোনো সরকারি অনুদান নেন না।
কালিপদ ভূঞ্যার এই মহৎ কর্মযজ্ঞে পাশে থাকে ‘ভোলেবাবা সংঘ’! এই সংঘের সমস্ত সদস্য স্বাধীনতা দিবসের কয়েকদিন আগে থেকেই কাজে নেমে পড়েন। বাজার করা, রান্না করা, মঞ্চ সাজানো, ছাত্রছাত্রীদের লাইনে দাঁড় করানো – সব কাজে তাঁরা কালিপদর হাতকে শক্ত করেন।
সংঘের সদস্যরা বলেন, _“কালিপদদা আমাদের প্রেরণা। উনি ফৌজি মানুষ। দেশের জন্য জীবন দিতে পারেন। আর আমরা ওর সঙ্গে থেকে গ্রামের জন্য সামান্য কাজ করি। এটাই আমাদের গর্ব।”
কালিপদ ভূঞ্যা এই সমাজসেবী মনোভাব উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। তাঁর পিতা ভগীরথ ভূঞ্যা দীর্ঘদিন ধরে এলাকার সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত। তিনিও ভোলেবাবা সংঘের একজন বিশিষ্ট কর্মকর্তা।
গ্রামের রাস্তা সংস্কার, গরিব মানুষকে বস্ত্রদান, দুর্গাপুজোয় দুঃস্থদের খাওয়ানো – সব কাজেই ভগীরথবাবুর নেতৃত্ব থাকে। ছেলের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এবং সমাজসেবার কাজকে তিনি সবসময় সমর্থন করেছেন।
ভগীরথ ভূঞ্যা বলেন, “ছেলে দেশের সেবা করছে, এটা আমার গর্ব। আর ও দেশে না থাকলেও ওর নামে যে কাজটা হয়, সেটা দেখে আমার মন ভরে যায়। স্বাধীনতা দিবসে ছেলেমেয়েদের মুখে হাসি দেখলে মনে হয় আমরাও দেশের জন্য কিছু করতে পারছি।”_
পিতা-পুত্রের এই যৌথ উদ্যোগে শ্রীরামপুর গ্রামে সমাজকল্যাণের কাজ আরও জোরদার হয়েছে।
কালিপদ ভূঞ্যার এই উদ্যোগে গোটা এলাকার মানুষ গর্বিত। অভিভাবক থেকে শিক্ষক, পঞ্চায়েত সদস্য থেকে সাধারণ মানুষ – সকলেই তাঁর প্রশংসা করেন।
ছাত্র ছাত্রীরা বলেন — “১৫ আগস্ট মানেই কালিপদ কাকুর টিফিন। আমরা সারাবছর এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করি। কাকু ফৌজি, তবুও আমাদের কথা ভাবেন।”
আজকালকার দিনে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে কেউ এভাবে ১৫ বছর ধরে কাজ করে যায়, ভাবা যায় না। কালিপদবাবুর প্রশংসায় উচ্ছসিত এলাকাবাসী।
কালিপদ ভূঞ্যার জীবন আমাদের শেখায় স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ। স্বাধীনতা মানে শুধু ১৫ আগস্ট পতাকা তোলা নয়। স্বাধীনতা মানে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ, শিক্ষিত ও দেশপ্রেমিক করে গড়ে তোলা।
সীমান্তে দাঁড়িয়ে যে সৈনিক দেশকে বাইরের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেন, সেই সৈনিকই যখন গ্রামে ফিরে শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেমের বীজ বপন করেন, তখনই স্বাধীনতা সম্পূর্ণ হয়।
কালিপদ ভূঞ্যা সেই কাজটাই করে চলেছেন নীরবে, নিঃশব্দে। কোনো প্রচার নেই, কোনো দাবি নেই। আছে শুধু একটাই লক্ষ্য – “আমার গ্রামের প্রতিটি বাচ্চা যেন গর্ব করে বলতে পারে, আমি স্বাধীন ভারতের নাগরিক।
তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানান, ডিউটির চাপ থাকলেও কালিপদ প্রতি বছর ১৪ আগস্ট রাতেই বাড়ি পৌঁছে যান। ১৫ তারিখ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্কুলে স্কুলে ঘোরেন। সন্ধ্যায় আবার ফিরে যান কর্মস্থলে।
তিনি বলেন, “আমার একার পক্ষে সব করা সম্ভব নয়। ভোলেবাবা সংঘ, গ্রামের মানুষ ও আমার বাবা পাশে আছেন বলেই পারছি। আমি চাই আমার মতো আরও যুবকরা এগিয়ে আসুক। দেশসেবার সঙ্গে সমাজসেবাও জরুরি।”
পটাশপুর-২ ব্লকের শ্রীরামপুর গ্রামের এই সৈনিক প্রমাণ করলেন, ইউনিফর্মের রং যাই হোক না কেন, মনের রংটা যদি দেশপ্রেমের হয়, তাহলে মানুষের সেবা যে কোনো জায়গা থেকেই করা যায়।
৮০তম স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে কালিপদ ভূঞ্যার মতো মানুষরাই আমাদের মনে করিয়ে দেন – দেশ গড়ার কাজটা সীমান্ত থেকেই শুরু হয় না, তা শুরু হয় নিজের গ্রামের স্কুলের মাঠ থেকে।