ছোট ছোট হাতেই আঁকা হচ্ছে বড় দেশপ্রেম: বারবাটিয়া হাইস্কুলে “হর ঘর তিরঙ্গা”
অলকেশ মাইতি, পটাশপুর, পূর্ব মেদিনীপুর , ১১ আগস্ট ২০২৬: দেশের স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবকে স্মরণীয় করে রাখতে পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর ২ ব্লকের বারবাটিয়া হাইস্কুলে এখন উৎসবের আবহ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা দফতরের নির্দেশ মতো বিদ্যালয় জুড়ে শুরু হয়েছে “হর ঘর তিরঙ্গা” কর্মসূচি।
তবে এই কর্মসূচির বিশেষত্ব এক জায়গাতেই – দেওয়ালে তুলি ধরেছে কোনো পেশাদার শিল্পী নয়, ধরেছে স্কুলেরই ছাত্র-ছাত্রীরা। তাদের প্রতিটি আঁচড়ে মিশে আছে দেশপ্রেম আর গর্ব।
সোমবার থেকে বিদ্যালয়ের দেওয়াল, প্রাচীর আর ক্লাসরুমের বারান্দা জুড়ে শুরু হয়েছে জাতীয় পতাকা আঁকার কাজ। একদল গেরুয়া রং করছে, একদল সাদা রং, আরেকদল মন দিয়ে নীল অশোকচক্র আঁকছে। ছোট ছোট হাতের অনভিজ্ঞ টানে যেন ফুটে উঠছে ১৪০ কোটি ভারতবাসীর স্বপ্ন। তুলি আর রং-এর পরশে যেন অভিজ্ঞতার পাহাড়।
ক্লাসের পড়া ফেলে রেখে জনাকয়েক ছাত্র-ছাত্রী ছুটে এসেছে দেওয়ালের কাছে। কারো হাতে রঙের দাগ, কারো জামায়, কারোও আবার মুখে। তবু কারোও চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ পড়েনি।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা অনুভূতি। তাদের কথাতেই উঠে এল সেই অনুভূতির ছবি:
ক্লাস ইলেভেনের ছাত্রী পিংকি পয়ড়্যার প্রত্যয়ী জবাব,
“স্যার বলেছেন এই পতাকার জন্য ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম বসু , মাতঙ্গিনী হাজরা, বিনয়-বাদল-দীনেশ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সহ হাজার হাজার বিপ্লবী জীবন দিয়েছেন। তাই বইয়ে পড়ে নয়, নিজের হাতে আঁকলে পতাকাকে আরও বেশি সম্মান করা যায়।”
শম্পা মহাপাত্র জানাল,
“প্রথমে অশোকচক্র আঁকতে ভয় লাগছিল। ২৪টা দাগ! কিন্তু বন্ধুরা মিলে গুনে গুনে আঁকছি। এখন মনে হচ্ছে আমরাও দেশের জন্য কিছু করতে পারলাম।”
চোখে-মুখে একরাশ উচ্ছ্বাস নিয়ে পারমিতা দের সোজাসাপ্টা কথা মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো —
“বাড়িতে মাকে বলেছি আমিও ১৫ আগস্ট ছাদে তিরঙ্গা লাগাব। স্কুল আর বাড়ি তিরঙ্গায় রাঙিয়ে দেবো।”
সুপর্ণা দাস বলল,
” জাতীয় পতাকার মধ্যে অশোকচক্রের প্রতিটা দাঁড়ি আঁকতে গিয়ে ইতিহাসের কথা মনে পড়ছে। ভুল হলে মুছে আবার আঁকছি। এ এক অন্যরকম পরীক্ষা।”
অভিক দাস অধিকারীর কথায়,
“আমরা ক্রিকেট খেলি, মোবাইল ঘাঁটি। কিন্তু আজ মনে হল দেশের জন্য রং করাটাও খেলার চেয়ে কম মজার নয়। এ দেশ আমার গর্ব। এ দেশ আমার মা!”
বিশ্বজিৎ দাস বলল,
” দেওয়ালে যখন সবুজ রং করছি , তখন খুব মনে পড়ছে আমাদের মাঠ-ঘাট, ধানখেতের কথা। এই সবুজই তো আমাদের প্রাণ।”
হাতে রং মাখামাখি হয়ে প্রসেনজিৎ রায় বলল,
“১৫ তারিখে বাবা-মাকে নিয়ে আসব। দেখাব এই দেওয়ালটা আমিই আঁকলাম। গর্ব হবে।”
রং তুলি হাতে ঋতম সাহু বলে ” কাগজে অনেক ছবি এঁকেছি, তবে আজকের অনুভূতি স্বতন্ত্র। এই প্রথম দেওয়ালে রং ছড়িয়ে দিলাম। তাও আবার জাতীয় পতাকা। যাকে আঁকড়ে ধরে বিপ্লবীদের কত স্বপ্ন দেখতাম।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশিস কুমার মিশ্র বলেন,
“আমরা চাইলে বাইরের দক্ষ শিল্পী দিয়ে দেওয়াল রাঙাতে পারতাম। কিন্তু তা করিনি। উদ্দেশ্য শুধু দেওয়াল সাজানো নয়, উদ্দেশ্য ছাত্র-ছাত্রীদের মনের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বীজ বপন করা। যখন ওরা নিজের হাতে তিরঙ্গা আঁকবে, তখন পতাকার প্রতি ওদের ভালোবাসা আর সম্মান দুটোই বাড়বে। বিদ্যালয়ের দেওয়াল, প্রাচীর – সব জায়গাতেই তিরঙ্গা আঁকা হবে।”
তাঁর কথায় স্পষ্ট, পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়েও কীভাবে দেশপ্রেম শেখানো যায় তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ এই বারবাটিয়া হাইস্কুল।
“হর ঘর তিরঙ্গা” – ঘরে ঘরে পতাকা, মনে দেশ
কেন্দ্রীয় সরকারের এই কর্মসূচির মূল বার্তা হল – ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা।
বারবাটিয়া হাইস্কুল সেই বার্তাকেই আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। এখানে শুধু পতাকা উত্তোলন নয়, পতাকা তৈরি হচ্ছে, আঁকা হচ্ছে, শেখা হচ্ছে।
শিক্ষক-শিক্ষিকারাও ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে রং মেশাচ্ছেন, অশোকচক্রের মাপ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। গোটা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এখন একটা বড় ক্যানভাস। আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান আর দেশপ্রেমের গল্পে মুখরিত স্কুল।
ইট-বালি-সিমেন্টের দেওয়ালে যখন গেরুয়া-সাদা-সবুজের ছোঁয়া লাগে, তখন সেই দেওয়াল শুধু ইটের থাকে না। তা হয়ে ওঠে জাতীয় চেতনার স্মারক।
বারবাটিয়ার ছাত্র-ছাত্রীরা প্রমাণ করল, দেশকে ভালোবাসতে বড় হতে হয় না। ছোট হাত, ছোট মন দিয়েও দেশের জন্য বড় কাজ করা যায়।
আগামী ১৫ আগস্ট যখন এই দেওয়ালের সামনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন হবে, তখন প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী গর্ব করে বলতে পারবে – “এই তিরঙ্গা আমরাই এঁকেছি”।