নক্ষত্রপতন — ৩৮-এ থেমে গেলেন অভিনেতা : অভিনয় বেঁচে থাকবে চিরকাল
৬ আগস্ট, muthokotha.in: মারাঠি থিয়েটার জগতে নেমে এলো গভীর শোকের ছায়া। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন প্রখ্যাত অভিনেতা হৃষিকেশ কানাড়ে। তাঁর অকাল মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ সহ-অভিনেতা, পরিচালক, বন্ধু এবং লক্ষ লক্ষ দর্শক। মঞ্চ যাঁকে ভালোবেসেছিল, সেই অভিনেতা মৃত্যুকালে রেখে গেলেন বাবা-মা, বোন ও সহধর্মিনীকে।
একজন অভিনেতার চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি গোটা শিল্পের ক্ষতি। হৃষিকেশের ক্ষেত্রে সেই ক্ষতটা আরও গভীর — কারণ তিনি ছিলেন সেই বিরল শিল্পী যিনি দেশপ্রেমের গল্পকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রাণ দিতে পারতেন।
“মী ভারতীয়” — ৩০০ বার হাততালি কুড়ানো সেই নাম হৃষিকেশ কানাড়ে । তাঁকে এক নামেই চিনত মারাঠি দর্শক — “মী ভারতীয়” নামে। দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী ভাবনার উপর ভিত্তি করে তৈরি এই নাটকে তাঁর অভিনয় ছিল কিংবদন্তিতুল্য।
নাটকে তিনি এমন এক চরিত্রে অভিনয় করতেন যা শুধু সংলাপ নয়, দর্শকের বুকের ভিতর দেশভক্তির আগুন জ্বালিয়ে দিত। মঞ্চে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে গোটা হল “ভারত মাতা কী জয়” ধ্বনিতে ফেটে পড়ত।
রেকর্ড বলছে, তিনি এই নাটকে ৩০০ বারেরও বেশি অভিনয় করেছেন। ৩০০ বার একই সংলাপ, একই আবেগ, একই তীব্রতা নিয়ে দর্শকের সামনে দাঁড়ানোটা শুধুমাত্র পেশাদারিত্বের কারণে নয়, এটি সাধনা। বহু দর্শক আছেন যাঁরা শুধু হৃষিকেশকে দেখার জন্যই বারবার টিকিট কেটে “মী ভারতীয়” দেখতে গেছেন।
মঞ্চে তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠ, চোখের দৃঢ়তা এবং শরীরী ভাষা — সব মিলিয়ে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে একটি স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন, যা দর্শক মন থেকে উধাও হতে পারে না।
হৃষিকেশ শুধু এক ধরনের চরিত্রে আটকে থাকেননি। তিনি নিজেকে ক্রমাগত ভেঙেছেন, নতুন করে গড়েছেন। “কল অফ ডিউটি” এবং “নূর মঞ্জিল” — এই দুটি নাটকে তিনি প্রধান চরিত্রে ছিলেন। যুদ্ধ, ত্যাগ, মানবিকতা — জটিল বিষয়গুলোকে তিনি মঞ্চে অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। সহ-অভিনেতারা বলতেন, হৃষিকেশের সঙ্গে মঞ্চ শেয়ার করা মানে অভিনয়ের ক্লাস করা।
টেলিভিশনেও তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। “তু মে আনি তো” শো-তে অভিনেত্রী সুখদা খন্দকর এবং দীপ্তি লেলের সঙ্গে তাঁর রসায়ন দর্শকদের খুব পছন্দের ছিল। সিরিয়াস নাটকের পাশাপাশি কমেডিতেও তিনি সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন।
অভিনয়ে সাবলীলতা, মঞ্চে চিত্তাকর্ষক উপস্থিতি এবং সবচেয়ে বড় কথা — তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাব। জুনিয়র শিল্পীরা বলতেন, “হৃষিকেশ দাদা” মঞ্চের বাইরেও সবার খোঁজখবর নিতেন। নতুনদের উৎসাহ দিতেন, ভুল ধরিয়ে দিতেন।
মৃত্যুর খবর ছড়ানোর পরেই “দ্য থিয়েটার ইন্ডিয়া কোম্পানি” তাদের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি আবেগঘন পোস্ট করেছে। তাতে লেখা হয়—
“গভীর দুঃখের সঙ্গে আমরা জানাচ্ছি যে, আমাদের প্রিয় সহকর্মী, ‘কল অফ ডিউটি’ এবং ‘নূর মঞ্জিল’-এর প্রধান অভিনেতা হৃষিকেশ কানাড়ে গতকাল পরলোকগমন করেছেন। আমরা এখনও এই মর্মান্তিক ঘটনার ধাক্কা সামলে উঠতে পারিনি।”
পোস্টের সঙ্গে তারা “মী ভারতীয়” নাটকে হৃষিকেশের একটি ভিডিও শেয়ার করেন। ভিডিওতে তাঁর সেই তীব্র চোখ, গর্জে ওঠা সংলাপ দেখে বহু অনুরাগী কেঁদে ফেলেন।
কোম্পানি আরও লেখে: “হৃষিকেশ শুধু একজন অসাধারণ অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের সেরা বন্ধু, একজন দয়ালু মানুষ এবং এমন একজন শিল্পী যিনি মঞ্চে তাঁর সান্নিধ্যে আসা প্রত্যেকের মনে এক অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গেছেন।”
শেষে তাঁরা পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে লেখেন, “হৃষিকেশ, তোমার অভাব আমরা চিরকাল অনুভব করব। তবে, তোমার শিল্পকর্ম এবং তোমার রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।”
হৃষিকেশের প্রয়াণে মারাঠি থিয়েটার হারালো একজন “পাওয়ার পারফর্মার”। যে অভিনেতা দর্শক টানতে পারতেন, যে অভিনেতা তরুণদের মঞ্চে আসতে অনুপ্রাণিত করতেন।
আজকের দিনে যখন ওটিটি এবং সিনেমার ভিড়ে থিয়েটার টিকে থাকার লড়াই করছে, তখন হৃষিকেশের মতো শিল্পীরাই ছিলেন থিয়েটারের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। তাঁর “মী ভারতীয়” হাউসফুল যেত — এর অর্থ হল ভালো গল্প এবং ভালো অভিনয় থাকলে দর্শক আজও হলে আসে।
তাঁর চলে যাওয়ায় একটা বড় শূন্যতা তৈরি হল। “মী ভারতীয়” এর পরের শো কে করবে? সেই জায়গা কি আর কেউ ভরাট করতে পারবে?