৩ আগস্ট, দিনহাটা, muthokotha.in : সোমবার সকালে স্কুলের বেঞ্চে বসে পরীক্ষা দিচ্ছিল সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র তন্ময় বর্মণ। খাতা-কলম, প্রশ্নপত্র, সহপাঠীদের ফিসফাস – রোজকার মতোই ছিল দিনটা। কিন্তু ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই বদলে গেল সবকিছু। অসুস্থ হয়ে পড়ল তন্ময়। শিক্ষক-শিক্ষিকারা দ্রুত তাকে নিয়ে ছুটলেন দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একটা স্কুল, একটা পরিবার, গোটা এলাকা ডুবে গেল শোকের অন্ধকারে।
ঘটনাটি ঘটেছে দিনহাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে। মৃত ছাত্রের নাম তন্ময় বর্মণ, বয়স ১৩। বাড়ি দিনহাটা থানার অন্তর্গত বড়ডাঙার ভিটাগুড়ি এলাকায়। সে ওই স্কুলেরই সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিল।
স্কুল সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল থেকে যথারীতি পরীক্ষা চলছিল। প্রথম দিকে তন্ময়কে স্বাভাবিকই দেখাচ্ছিল। কিন্তু পরীক্ষা চলাকালীন আচমকাই সে অসুস্থ বোধ করে। সহপাঠীরা শিক্ষকদের খবর দেয়। দ্রুত তাকে প্রাথমিক শুশ্রূষা দেওয়ার চেষ্টা করেন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। অবস্থার অবনতি হওয়ায় আর দেরি না করে স্কুলের উদ্যোগে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে পরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন। আকস্মিক এই ঘটনায় হাসপাতাল চত্বরেও নেমে আসে শোকের ছায়া। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন তন্ময়ের পরিবারের লোকজন এবং স্কুলের শিক্ষকরা।
তন্ময়ের মৃত্যুর খবর ভিটাগুড়ি গ্রামে পৌঁছতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিজনরা। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা বাবা-মা। পাড়া-প্রতিবেশীরাও এই অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না।
দিনহাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, “ছেলেটি খুব শান্ত স্বভাবের ছিল। নিয়মিত স্কুলে আসত। আজ পরীক্ষা দিতে এসেও আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু…” গলা বুজে আসে তার। সহপাঠীদের চোখেও জল। যে বেঞ্চে বসে কিছুক্ষণ আগেও খাতায় লিখছিল তন্ময়, সেই বেঞ্চ এখন ফাঁকা।
আপাতত তন্ময়ের মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি। পুলিশ মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে না আসা পর্যন্ত কিছুই বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসকরা।
পুলিশ সূত্রে খবর, অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শারীরিক অসুস্থতার কারণেই মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে হার্ট অ্যাটাক, নাকি অন্য কোনও কারণ – তা রিপোর্ট এলেই স্পষ্ট হবে।
একটি স্কুলের মধ্যে, পরীক্ষার সময়ে ছাত্রের মৃত্যু – স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে স্কুলে জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে। স্কুলে কি নার্স ছিলেন? প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম ছিল? সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া গিয়েছিল তো?
স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই সবরকম চেষ্টা করা হয়েছে। শিক্ষকরাই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তবুও অভিভাবক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে – স্কুলগুলিতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তন্ময়ের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কতটা ভঙ্গুর আমাদের শিশুদের জীবন। মোবাইল, পড়াশোনার চাপ, খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম – এই সবের মাঝে আমরা কি আমাদের ছেলেমেয়েদের শরীরের দিকে ঠিকমতো নজর দিচ্ছি?
বড়ডাঙার ভিটাগুড়ির বাড়িটা এখন নিস্তব্ধ। আলমারিতে সাজানো বই, খাতা, স্কুলের ব্যাগ – সবই পড়ে আছে। আর ফেরা হবে না তন্ময়ের। আর পরীক্ষার হলে বসা হবে না তার।
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলে হয়তো মৃত্যুর চিকিৎসাশাস্ত্রীয় কারণ জানা যাবে। কিন্তু একটা মায়ের কোল খালি হওয়ার, একটা স্কুলের একটা বেঞ্চ ফাঁকা হওয়ার কারণ – তার ব্যাখ্যা হয় না।