মগরাহাট, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, Muthokotha.in: দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটের জয়েন খাঁ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলের বারান্দা। মেঝেতে সার দিয়ে বসে রয়েছে ১৮৫ জন কচিকাঁচা। সামনে কানা-উঁচু স্টিলের বাটি। গরম ভাত আর ডিম-আলুর তরকারি। মিড-ডে মিল চলছে। চারপাশে হাসি, গল্প, কলকল শব্দ। মনে হচ্ছে যেন ফিস্ট চলছে।
কিন্তু ভিড়ের মধ্যে চোখ আটকে যায় এক জায়গায়। বছর ছয়েকের এক খুদে, ফোকলা দাঁতে হাসছে। পাতের পাশে বাটি, কিন্তু ডিমটা নেই। কোথায় গেল? প্রশ্নটা করলেন স্কুলের শিক্ষক সাদ্দাম হোসেন। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর ডিম কোথায় রে খুশি?’
উত্তরে খুদে মেয়েটি আরও হাসল। তার সরু কব্জির স্টিলের বালা ঝনঝন করে উঠল। ফ্রকের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল যখের ধন —একটা গোটা সিদ্ধ ডিম!
‘এই তো!’ হাতের ছোট্ট মুঠো খুলে দেখাল সে।
সাদ্দাম স্যার অবাক হয়ে বললেন, ‘ সে কী! তুই খাবি না?’ খুশি কর ফোকলা হাসিতে গড়িয়ে পড়ে বলল, ‘না, ভাইয়ের জন্য নিয়ে যাচ্ছি।’
পাশেই বসে খুশির মতোই আর এক খুদে। সেই ক্ষুদেটি তার ভাই। স্যাররা বলেন, ‘ও কিন্তু প্রতিদিন নিয়ে যায়।’
অমনি প্রবল আপত্তি খুশির। দু’দিকে মাথা নেড়ে বলে, ‘না গো স্যার, আমি তো প্রতিদিন খাই। ভাই এক দিন খাক।’
একটা কথায় স্তব্ধ হয়ে যায় বারান্দা। ভাতের থালার উপর রোদ এসে পড়ে। আর সেই রোদের মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকে একটা ছয় বছরের মেয়ের ভালোবাসা। সেই ভালবাসা রাঙা আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে স্কুলের বারান্দায়, স্তব্ধতা ভেঙে যায়।
খুশি কর। জয়েন খাঁ এলাকার ছোট্ট এই মেয়ে। বাবা শম্ভু কর টোটো চালিয়ে সংসার নির্বাহ করেন। প্রতিটি দিন তাঁর কাছে নতুন লড়াই। খুচরো আয়, খুচরো হিসেব। মা পল্লবী ঘর সামলান। গেরস্থ বুদ্ধির সুতো দিয়ে তালি মারেন অভাবের ছেঁড়া কাঁথায়। সোনা-রুপোর বালা কেনার সামর্থ্য নেই। তাই খুশির হাতে স্টিলের বালা।
অভাব তাঁদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু খুশির মুখে অভাবের ছায়া নেই। সারাক্ষণ হাসি। স্কুলের স্যররা তাই আদর করে ওকে ‘দিশা’ বলে ডাকেন। প্রধান শিক্ষক তপন পর্বত বলেন, “খুশি ওই রকমই। নিজে না খেয়ে অন্যকে দেওয়াটাই ওর স্বভাব। আমরা গর্বিত ওর মতো ছাত্রী পেয়ে।”
জয়েন খাঁ ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে ছাত্রছাত্রী ১৮৫ জন। শিক্ষক মাত্র পাঁচজন। স্কুলের সব কাজ — জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ — সব সামলান প্রধান শিক্ষক নিজেই।
এদিকে আবার মিড-ডে মিলের মেনুতেও অভাবের ছাপ। সপ্তাহে একদিনই ডিম, বুধবার। বাকি দিন ডাল, সব্জি, সোয়াবিন, খিচুড়ি। মাঝে মাঝে ভাগ্যে জোটে মাছ বা চিকেন। নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে স্কুলের ওই একটা ডিমের দাম অনেক। কারও কারও কাছে সেটাই সপ্তাহের একমাত্র আমিষ।
সাদ্দাম স্যর নরম গলায় খুশিকে বোঝান, “ঠিকই তো, কখনও তুই খাবি, কখনও ভাই খাবে। কিন্তু খেতে হবে তো মা।” খুশি সব শোনে। তারপর আবার ভাত মাখে। ঝোল-আলু দিয়ে মাখা ভাত ছোট্ট হাতের পাঁচটি আঙ্গুল ছুঁয়ে খুশির দিকে চেয়ে আছে। এরপর ডিমটা সযত্নে ফ্রকের পকেটে ঢুকিয়ে নেয় সে । যেন কোহিনূর।
একটা ডিম দু’ভাগ করা যায়। ছুরি দিয়ে কেটে আধখানা ভাইকে, আধখানা নিজে খাওয়া যায়। কিন্তু ভালোবাসা?
খুশির হিসেব আলাদা। ওর কাছে ভাইয়ের পেট ভরা মানেই নিজের পেট ভরা। মা-বাবা যে কষ্ট করে সংসার চালান, সেই কষ্টটা ও ছোটবেলা থেকেই দেখেছে। তাই পাওয়া জিনিসটুকুও ভাগ করে নিতে শিখেছে।
বারান্দার একপাশে তখনও চলছে খাওয়া। কেউ গল্প করছে, কেউ মারামারি করছে ভাতের জন্য। আর মাঝখানে খুশি। ভাত খাচ্ছে, আর মাঝে মাঝে পকেটে হাত দিয়ে দেখছে ডিমটা ঠিক আছে তো।
এই স্কুল, এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষই নিম্নবিত্ত। কেউ টোটো চালায়, কেউ সব্জি বেচে। অভাব কোলে-কাঁখে বড় হওয়া মানুষজন।
তবু এই অভাবের মধ্যেই খুশির মতো শিশুরা শেখাচ্ছে বড় হওয়ার মানে। শেখাচ্ছে ত্যাগের মানে।
সাদ্দাম স্যর বলেন, “আমরা বইয়ে অনেক নীতিকথা পড়াই। কিন্তু খুশির মতো একটা বাচ্চা একটা ডিম হাতে করে দেখিয়ে দেয় — নীতিকথা আসলে কেমন হয়।”
খাওয়া শেষ। খুশি উঠে দাঁড়ায়। পকেটে ডিম, মুখে হাসি। স্কুল ছুটির পর সোজা বাড়ি। ভাইয়ের হাতে ডিমটা তুলে দেবে। তারপর হয়তো বলবে, “নে, আজ তুই খা। কাল আমি খাব।”
মগরাহাটের এই ছোট্ট স্কুলের বারান্দায় রোজ মিড-ডে মিল হয়। ভাত হয়, ডাল হয়। কিন্তু বুধবারের ডিমের দিনটা আলাদা। কারণ সেদিন বোঝা যায়, পেটের খিদের চেয়েও বড় খিদে থাকে মনের।
খুশি কর শেখাল, না-পাওয়ার আক্ষেপ দিয়ে জীবন চলে না। যা পেয়েছি, তা ভাগ করে নিলেই পৃথিবীটা সুন্দর হয়।
‘রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে/ প্রজাপতি দোলে ঘাসে ঘাসে’ — রবীন্দ্রনাথের এই লাইনগুলো যেন খুশির জন্যই লেখা। ওর ফোকলা হাসি, ওর পকেটের ডিম — সব মিলিয়ে অভাবের কাঁথাটা ধুয়ে যায় এক ঝর্নাধার মতো।
এই ঘটনা দিয়ে যায় একটা শিক্ষা,— ভালোবাসা ভাগ করলে কমে না, বাড়ে।