২৫ জুলাই, কলকাতা,muthokotha.in : ড্রাগন আছে নাকি নেই — এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আপামর মানুষের আগ্রহ বহু যুগের। ‘গেম অফ থ্রোনস’, ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’, ‘হবিট’, ‘হ্যারি পটার’-এর মতো কাল্পনিক দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রই এই আগুন-উদ্গীরণকারী পৌরাণিক প্রাণী। বাস্তবে তার অস্তিত্ব না থাকলেও, সিনেমা-সিরিজ়ে কিন্তু ড্রাগন দেখেই আমরা রোমাঞ্চিত হইনা এমন কেউ নেই।
কিন্তু সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে ভেসে আসা একটি ভিডিও সেই পুরনো কৌতূহলকে আবার জাগিয়ে তুলল। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর আকাশে নাকি উড়ে বেড়াচ্ছে একটি আসল ড্রাগন! ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। ভাইরাল হওয়ার পর নেট দুনিয়া দ্বিধাবিভক্ত — কেউ বলছেন “এটা CGI”, কেউ আবার বিস্ময়ে লিখছেন “ড্রাগন সত্যিই আছে!”
ঘটনাস্থল গ্লাসগোর ক্লাইড নদী এবং তার পাশে থাকা বিখ্যাত ‘OVO Hydro’ কনসার্ট ভেন্যু। স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ৪৫ মিনিট নাগাদ আকাশে দেখা যায় বিশালাকৃতির এক উড়ন্ত অবয়ব। দূর থেকে দেখতে অনেকটা ড্রাগনের মতোই। লম্বা গলা, লম্বা লম্বা ডানা মেলে ওড়া — সব মিলিয়ে একেবারে পৌরাণিক দৃশ্য।
এই রোমাঞ্চকর ভিডিওটি প্রথম ক্যামেরাবন্দি করেন স্থানীয় এক রেডিও সঞ্চালক ইউয়েন ক্যামেরন। তিনি তাঁর কাজে যাওয়ার আকাশে এই দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যান। পরে তিনি সমাজমাধ্যমে ভিডিওটি শেয়ার করে লেখেন, “OVO Hydro-র কাছে নদীর উপর ড্রাগনের মতো দেখতে একটি প্রাণীকে উড়তে দেখেছি।”
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুহূর্তের মধ্যেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। X হ্যান্ডল ‘জিয়ো’ থেকে পোস্ট হওয়া ওই ভিডিওতে লাইক-কমেন্টের বন্যা। নেটাগরিকরা নিজেদের মতো তত্ত্ব খাড়া করতে শুরু করেন।
ভিডিও দেখার পর দু’ভাগ হয়ে যান নেট নাগরিকেরা। একদল লিখলেন, “অবশেষে প্রমাণ পাওয়া গেল! পৌরাণিক প্রাণীরা লুকিয়ে আছে।”
আরেকদল রসিকতা করে লিখলেন —
“এটি আসলে ‘রিজড ব্যাক’ প্রজাতির ড্রাগন। ওয়েলসে এদের প্রায়ই দেখা যায়। তবে স্কটল্যান্ডে বিরল। কালো জিভওয়ালা ড্রাগনের মতো এরা আগুন ছড়ায় না ঠিকই, তবে বেশ আক্রমণাত্মক।” আরেকজন মজা করে লিখলেন, “আরে এ তো আমার পোষা ড্রাগন! খাঁচা থেকে পালিয়ে গেছে!”
মিম, রিল, থিওরির বন্যা বয়ে যায়— কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঝোড়ো হাওয়া হয়ে ভিডিওটি ইন্টারনেটের হট টপিক হয়ে ওঠে।
তবে কয়েক ঘণ্টার জল্পনার পর সামনে এল আসল সত্য। আকাশে ওড়া সেই “ড্রাগন” আসলে কোনও জীবন্ত প্রাণী ছিল না। এটি ছিল HBO-র জনপ্রিয় সিরিজ় ‘হাউস অফ দ্য ড্রাগন’-এর অন্যতম ড্রাগন ‘সাইরাক্স’-এর একটি পূর্ণ-আকৃতির উড়ন্ত মডেল।
সিরিজ়ের প্রচারের জন্যই এই অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আর এই উড়ন্ত ড্রাগনটি বানিয়েছে জার্মানির বিখ্যাত সংস্থা ‘এয়ারস্টেজ’।
এর ওজন প্রায় ১৩ কেজি । কার্বন ফাইবার এবং হালকা ফোম দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এর কাঠামো । এটির পেটের মধ্যে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ছোট ইঞ্জিন । এই ড্রাগনটিকে ওড়ানোর দায়িত্বে ছিলেন প্রযুক্তিবিদ ডেনিস গুটোস্কি।
ডেনিস গুটোস্কি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “এটা সাধারণ রিমোট-কন্ট্রোলড বিমান ওড়ানোর মতো নয়। এই ড্রাগনকে বাতাসে স্থির রাখা, ডানা নাড়ানো এবং নির্দিষ্ট পথে ওড়ানোর জন্য প্রচুর প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতার প্রয়োজন হয়। বাতাসের গতি, ভারসাম্য — সবকিছু হিসাব করে উড়াতে হয়।”
‘হাউস অফ দ্য ড্রাগন’-এর নতুন সিজ়নের প্রচারের কৌশল হিসেবেই গ্লাসগোর মতো বড় শহরের আকাশে এই মডেল ওড়ানো হয়। উদ্দেশ্য একটাই — মানুষের মধ্যে সিরিজ় নিয়ে কৌতূহল তৈরি করা। আর সেই উদ্দেশ্য ১০০% সফল। কারণ একটা ভিডিও গোটা দুনিয়াকে ভাবিয়ে তুলেছে “ড্রাগন কি সত্যি?”
ব্র্যান্ডিংয়ের এই নতুন ফর্মুলা প্রমাণ করল, মানুষ এখনও কল্পনার জগৎকে বাস্তবে দেখতে চায়। VFX বা পোস্টার নয়, আকাশে সত্যিকারের মতো উড়তে থাকা একটি ড্রাগন মডেল মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ মানুষের নজর কেড়ে নেয়।
এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করল, মানুষের মনে ড্রাগনের প্রতি আকর্ষণ এতটুকুও কমেনি। বরং প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, কল্পনার সেই প্রাণীকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে আসা ততই সহজ হচ্ছে। গ্লাসগোর ভোরের আকাশে ১৩ কেজির এই কার্বন ফাইবারের ড্রাগন দেখে আমরা যতই চমকাই না কেন, আসল ড্রাগন এখনও রয়েছে গল্পে, সিনেমায় এবং আমাদের স্বপ্নে।
তবে এয়ারস্টেজ এবং ডেনিস গুটোস্কির এই ‘সাইরাক্স’ নিঃসন্দেহে দেখিয়ে দিল — প্রযুক্তি চাইলে কল্পনাকেও ডানা মেলাতে পারে। আর সেই ডানার ঝাপটাতেই মুহূর্তে কেঁপে ওঠে গোটা পৃথিবীর মন। তাই পরের বার আকাশে অদ্ভুত কিছু দেখলে আগে ভিডিও করুন, তারপর গুগল করুন। হতে পারে সেটা এলিয়েন নয়, হতে পারে সেটা আপনার প্রিয় কোনো সিরিজ়ের নতুন প্রচার!