অলকেশ মাইতি, ১৮ জুলাই, Muthokotha.in : টানা ২১ দিন। এক ফোঁটা জলও না। শরীর ভেঙে পড়েছে, ৮ কেজি ওজন কমেছে আশঙ্কাজনক ভাবে। শনিবার ভোরের দিকে দিল্লির যন্তর মন্তরে তাঁর অনশন মঞ্চ থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে খবর পাওয়া গেছে। লাদাখের সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ এবং বিজ্ঞানী ৫৮ বছর বয়সী সোনম ওয়াংচুককের অনশনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তাঁর জীবন বাঁচাতে দিল্লি পুলিশ বাধ্য হয়ে তাঁকে অনশন মঞ্চ থেকে তুলে নিয়ে যায়। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য “গণতান্ত্রিক কণ্ঠ রোধ” করতে জোর করে অনশন ভাঙানো হলো।
সাম্প্রতিক নিট কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা ২১ দিনের মাথায় এসে পৌঁছল চরম এক সংঘাতের জায়গায়।
জানা গেছে শনিবার ভোর ৫টা নাগাদ যন্তর মন্তরের ধর্না মঞ্চে আচমকা পুলিশের গাড়ি গিয়ে পৌঁছায়। পুলিশ গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সও যায়। দীর্ঘ অনশনের পর সোনম ওয়াংচুক এখন প্রায় কথা বলতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে পুলিশ আধিকারিকরা এসে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি অনশন ভাঙতে রাজি ছিলেন না।
প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করছেন, একপ্রকার জোর করেই তাঁকে স্ট্রেচারে তোলা হয়। সঙ্গে ছিলেন সাম্প্রতিক চর্চিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র কর্মীরা। তাঁরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে , পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তি হয়। সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে দিল্লি পুলিশ ওয়াংচুককে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে নিয়ে যায়।
বিশেষ সূত্রে জানা গেছে , হাসপাতালে ভর্তির সময় তাঁর ব্লাড প্রেসার, সুগার ও ইলেক্ট্রোলাইটের মাত্রা বিপদসীমার নীচে ছিল। আর যদি ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা দেরি হতো , তাহলে পরিস্থিতি খুবই মারাত্মক হতে পারত বলে ডাক্তাররা মনে করছেন।
এই আন্দোলনের শুরু হয়েছিল ২০ জুন । মূলতঃ সমাজ মাধ্যমের ওপর ভর করে দ্রুত ঝড়ের গতিতে বাড়তে থাকা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সাম্প্রতিক নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দুর্নীতির প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে ধর্না আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনে তাঁদের প্রধান দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা।
আন্দোলন শুরু হওয়ার ৭ দিন পর অর্থাৎ ২৭ জুন থেকে আমরণ অনশনে বসেন সোনম ওয়াংচুক। তাঁর যুক্তি ছিল, “শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়। ,হতাশ হয়ে ছাত্ররা আত্মহত্যা করছে, আর সরকার চুপচাপ বসে আছে।”
আন্দোলনের প্রথম ১০ দিন মিডিয়া ও রাজনৈতিক দলগুলির খুব একটা নজর দিয়েছিল না। কিন্তু দিন যত এগিয়েছে , ওয়াংচুকের শরীর তত ভেঙেছে আর ততই চাপ বেড়েছে বিজেপি সরকারের উপর। সোশ্যাল মিডিয়ায় #SaveSonamWangchuk ট্রেন্ড করতে শুরু করে।
শুক্রবারই এই আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে জাতীয় কংগ্রেস। টানা ২০ দিন ধরে বিশেষ দূরত্ব রাখার পর অবশেষে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ওয়াংচুকের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
জাতীয় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সনিয়া গাঁধী সেদিন একটি পুরাতন ঘটনা মনে করিয়ে দিলেন। ১৯৮৪ সালে সোনমের বাবা সোনম ওয়াংগিয়াল লাদাখকে তফসিলি জনজাতির তকমা দেওয়ার দাবিতে অনশন করেছিলেন। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গাঁধী । সেদিন প্রধানমন্ত্রী নিজেই গিয়ে সোনম ওয়াংগিয়ালের অনশন ভাঙিয়েছিলেন। এরপর জাতীয় কংগ্রেসের মুখপাত্র পবন খেরা যন্তর মন্তরে গিয়ে ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বিজেপি সরকারের অনমনীয় মনোভাবের কথা তুলে ধরে বলেন, “মোদী সরকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা শোনে না। তাই দয়া করে নিজের জীবন বিপন্ন করবেন না। আপনি অনশন ত্যাগ করুন।”
শেষমেষ মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে বিজেপি সরকার সরকারের তড়িঘড়ি অনশন তুলবার চেষ্টা করতে শুরু করে। দিল্লি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি দেবেন্দ্রকুমার উপাধ্যায় ও বিচারপতি তেজস কারিয়ার ডিভিশন বেঞ্চ বলে, “কেন্দ্রীয় সরকারকে অনশনরত সোনম ওয়াংচুকের জীবনরক্ষার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ করতে হবে। সরকারি চিকিৎসকদের দিয়ে প্রতিদিন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে।” আদালত আরও বলে, চিকিৎসকরা যদি হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন, তবে তা অতিসত্বর মানতে হবে সরকারকে।
এই নির্দেশ পাওয়ার ৩৬ ঘণ্টার মাথায় শনিবার ভোরে পুলিশি হস্তক্ষেপে ওয়াংচুকের অনশন তোলার বন্দোবস্ত করে কেন্দ্র সরকার । সরকারি সূত্রের দাবি, “আমরা আদালতের নির্দেশই মানছি।”
বহুল আলোচিত সোনম ওয়াংচুক শুধু একজন বিদ্বজ্জন বা শিক্ষাবিদ নন। তিনি লাদাখের ছাত্রদের জন্য ‘সেকমল’ স্কুল গড়েছেন। বিশ্ববিখ্যাত ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির “ফুনসুক ওয়াংডু” চরিত্রের অনুপ্রেরণা কিন্তু সোনম ওয়াংচুক। সমাজ, প্রকৃতি , শিক্ষা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, লাদাখের পরিবেশ রক্ষা – সমস্ত বিষয়েই তিনি সোচ্চার আন্দোলন সংগঠিত করেছেন।
তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে. আংমো একজন প্রতিষ্ঠিত ক্যারাটে প্রশিক্ষক এবং শিক্ষাবিদ। যে বিষয়টি চর্চার বাইরে থেকে গেছে, তা হলো তাঁর স্ত্রী। এই অনশনকালে দেশের বহু বিজ্ঞ মানুষ সোনমকে অনশন ভাঙার অনুরোধ করলেও গীতাঞ্জলি কিন্তু স্বামীর সিদ্ধান্তের পাশে থেকেছেন। দায়িত্ব সহকারে শনিবার সকালে হাসপাতালে ভর্তির পর তিনিও দিল্লি পৌঁছেছেন।
সোনমের অনশন কর্মসূচি আপাতত বন্ধ হলেও ‘কখরোচ জনতা পার্টি’ জানিয়েছে আন্দোলন বন্ধ থাকবে না। পার্টির নেতা অভিজিৎ দীপক বলেন, “সোনম স্যার যতদিন সুস্থ না হচ্ছেন, ততদিন আমরা ধরনা চালাব। শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।”
সামনেই সংসদের বাদল অধিবেশন । প্রত্যাশিতভাবেই বিরোধীরা ঠিক করেছে এই ইস্যু নিয়ে তারা এই অধিবেশনে ঝড় তুলবে। অন্যদিকে বিজেপি শিবিরের পরিষ্কার বক্তব্য, “নিট নিয়ে তদন্ত চলছে। দোষীদের অবশ্যই শাস্তি হবে।”
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাস্তায় এখন দু’রকম ছবি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে যন্তর মন্তরে ওয়াংচুকের সমর্থকদের মোমবাতি মিছিল চলছে, আর অন্যদিকে সরকারি তরফে প্রচার চলছে , “ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ কেউ রাজনীতি করছে।”
পরীক্ষার একটি প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু হয়ে এই আন্দোলন। সেইখান থেকে এই আন্দোলনের রেখাপথ সরকার বনাম নাগরিক সমাজের লড়াইয়ের জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান জীবন মরণের যুদ্ধে পড়ে সোনম ওয়াংচুকের শরীর সুস্থ হবে কিনা, সেটা যেমন সময় বলবে, তেমনই তাঁর দাবি কেন্দ্র সরকার মেনে নেবে কিনা সেটাও সময় বলবে। তাই সেই মূল্যবান সময়ের দিকে এখন দেশবাসীর চোখ।