অলকেশ মাইতি, ১৬ জুলাই, muthokotha.in: বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ধর্মীয় শোভাযাত্রার নাম যদি কিছু হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে পুরীর জগন্নাথ রথযাত্রা। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে উড়িষ্যার পুরী শহর পরিণত হয় এক মহামিলন ক্ষেত্রে। লক্ষ কণ্ঠে “জয় জগন্নাথ”, “হরি বল”, “হুলুধ্বনি” আর ঢাক-কাঁসরের আওয়াজে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তিনটি বিশাল কাঠের রথ – নন্দীঘোষ, তালধ্বজ আর দেবদলন – গ্র্যান্ড রোড দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে ৩ কিলোমিটার দূরের গুন্ডিচা মন্দিরের দিকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো – কেন? কেন স্বয়ং জগৎপতি তাঁর রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বছরে একবার রাস্তায় নেমে আসেন? কেন রাজা থেকে ভিখারি সবাই একই দড়ি ধরে? এই ৯ দিনের যাত্রার পেছনে লুকিয়ে আছে পুরাণ, ইতিহাস, লোককথা আর মানুষের হৃদয়ের গভীরতম ভালোবাসার গল্প।
আসুন, ৭ টি পর্বে ভাগ করে দেখি সেই ইতিহাসের পাতাগুলি ——-
পর্ব ১: মূল পৌরাণিক ভিত্তি – কৃষ্ণের লীলা আর ভ্রাতৃপ্রেম
রথযাত্রার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রচলিত পৌরাণিক ব্যাখ্যা সরাসরি মহাভারত ও ভাগবতের যুগে নিয়ে যায় আমাদের।
১.১ দ্বারকার সেই দিন
স্কন্দ পুরাণ, ব্রহ্ম পুরাণ এবং পদ্ম পুরাণে এই কাহিনির উল্লেখ আছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ। দ্বারকায় শান্তি। একদিন মাতা রোহিণী, বলরামের মা, সুভদ্রাকে কৃষ্ণের বাল্যলীলা শোনাচ্ছিলেন। পুতনা বধ, শকট ভঞ্জন, কালীয় নাগ দমন, গোপীদের সঙ্গে রাসলীলা – প্রতিটি কথা শুনে সুভদ্রা ভাববিহ্বল হয়ে পড়েন।
ঠিক সেই সময় দরজায় এসে দাঁড়ান কৃষ্ণ ও বলরাম। বোনের মুখে নিজের কথা শুনে তাঁরাও আবেগে আপ্লুত হন। তিন ভাই-বোন তখন এমন এক ভাবসমাধিতে ডুবে যান যে বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁদের চোখ বড় বড় হয়ে যায়, হাত-পা নড়ে না, শুধু হৃদয়ে ভক্তির তরঙ্গ।
ভক্তরা বিশ্বাস করেন, পুরীর জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার যে অদ্ভুত দারুমূর্তি আমরা দেখি – বড় বড় গোল চোখ, অসম্পূর্ণ হাত-পা – তা আসলে সেই “ভাবাবস্থার”ই প্রতীক। তাঁরা তখন জাগতিক রূপের বাইরে চলে গিয়েছিলেন।
১.২ রথে চড়ে বৃন্দাবন গমন
এই ভাবস্থার পর কৃষ্ণ সুভদ্রা ও বলরামকে নিয়ে রথে চড়ে বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন গোপীদের সঙ্গে দেখা করতে। আবার অন্য মতে, এটা হলো কৃষ্ণের দ্বারকা থেকে মথুরায় প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।
তাই প্রতি বছর আষাঢ়ে জগন্নাথও তাঁর ভাই-বোনকে নিয়ে “মাসির বাড়ি” যান। আর এই মাসির বাড়িই হলো গুন্ডিচা মন্দির, যাকে বৈষ্ণবরা “বৃন্দাবন” হিসেবে মানেন। ৯ দিন পর “বাহুড়া যাত্রা”য় তিনি আবার নিজের মন্দিরে, অর্থাৎ “দ্বারকা”য় ফেরেন।
এই ব্যাখ্যা রথযাত্রাকে শুধু একটি উৎসব নয়, বরং ঈশ্বরের ভক্তের জন্য ব্যাকুলতা হিসেবে তুলে ধরে।
পর্ব ২: ইন্দ্রদ্যুম্ন ও দারুব্রহ্মের কাহিনি – মন্দিরের জন্মকথা
পুরীর মন্দির কেন হলো, আর বিগ্রহই বা এমন অদ্ভুত কেন – এর উত্তর দেয় রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের কাহিনি।
২.১ স্বপ্নাদেশ ও নীলমাধব
মালব দেশের রাজা ছিলেন ইন্দ্রদ্যুম্ন। তিনি ছিলেন বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন – সমুদ্রের তীরে নীলাচলে একটি স্বয়ম্ভু “দারুব্রহ্ম” বা কাঠের বিগ্রহ আছে। তিনি তৎক্ষণাৎ সৈন্য-সামন্ত নিয়ে পুরীতে আসেন।
খোঁজ করতে জানা যায়, কাছের জঙ্গলে বাস করতেন সবর রাজা বিশ্ববসু। তাঁর আরাধ্য দেবতা ছিলেন “নীলমাধব”। ইন্দ্রদ্যুম্নের পুরোহিত বিদ্যাপতি বিশ্ববসুর মেয়ে ললিতাকে বিয়ে করে সেই নীলমাধবের সন্ধান পান। কিন্তু যেই মুহূর্তে রাজা আসছেন শুনে বিশ্ববসু নীলমাধবকে মাটিতে পুঁতে দেন।
২.২ সমুদ্র থেকে ভাসমান কাঠ ও বিশ্বকর্মা
রাজা হতাশ হয়ে সমুদ্রতীরে তপস্যা শুরু করেন। তখন সমুদ্র থেকে ভেসে আসে এক প্রকাণ্ড নিম গাছের কাণ্ড। আকাশবাণী হয় – “এই কাঠ দিয়েই আমার মূর্তি গড়ো।”
কিন্তু কে গড়বে? দৈবাণী হলো – স্বয়ং বিশ্বকর্মা আসবেন, তবে শর্ত একটাই। ২১ দিন একটি বন্ধ ঘরে তিনি কাজ করবেন। কেউ যেন দরজা না খোলে।
রাজা রাজি হলেন। ১৪ দিন পর রানী গুন্ডিচার অস্থিরতায় দরজা খুলে দেখা গেল ঘর ফাঁকা। আর ভেতরে পড়ে আছে তিনটি অসম্পূর্ণ মূর্তি। হাত-পা নেই।
আবার আকাশবাণী – “এই রূপেই আমি পূজা নেব। কারণ ভক্তের ভাবে আমি রূপহীন।”
সেই থেকেই জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার এই নিরাভরণ রূপ। আর প্রতি ১২ থেকে ১৯ বছর অন্তর যখন জ্যৈষ্ঠ মাসে দুটি আষাঢ় পড়ে, তখন “নবকলেবর” অনুষ্ঠানে নতুন নিমকাঠ দিয়ে নতুন বিগ্রহ তৈরি হয়। পুরনো বিগ্রহকে “কোইলি বৈকুণ্ঠে” সমাধি দেওয়া হয়।
পর্ব ৩: গুন্ডিচা মন্দির – মাসির বাড়ি নাকি বৃন্দাবন?
গ্র্যান্ড রোডের শেষে ৩ কিমি দূরে অবস্থিত গুন্ডিচা মন্দির। একে “মাসির বাড়ি” বলা হয়। কিন্তু কেন?
৩.১ গুন্ডিচা রানির স্নেহ
কথিত আছে, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের রানি ছিলেন গুন্ডিচা। তিনিই প্রথম এই মন্দির তৈরি করেন। কৃষ্ণের মাসি যশোদার প্রতীক হিসেবে এই মন্দিরকে ধরা হয়। তাই জগন্নাথ প্রতি বছর ৯ দিনের জন্য মাসির কাছে বেড়াতে যান।
৩.২ লক্ষ্মীর অভিমান – হেরা পঞ্চমী
এটা সবচেয়ে মজার লোককথা। জগন্নাথ ৯ দিনের জন্য বউ লক্ষ্মীকে ছেড়ে চলে গেলে লক্ষ্মী দেবী রেগে যান। তিনি মন্দিরে তালা দিয়ে বসে থাকেন।
৫ম দিনে “হেরা পঞ্চমী” তিথিতে লক্ষ্মী স্বয়ং পালকি করে গুন্ডিচা মন্দিরে আসেন। সেখানে তিনি জগন্নাথের রথের একটা অংশ ভেঙে দেন এবং অভিমান করে ফিরে যান। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় – স্বামী-স্ত্রীর মান-অভিমানও ঈশ্বরীয় লীলার অংশ।
৩.৩ বৈষ্ণব তত্ত্ব: বৃন্দাবনের বিরহ
গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মতে, গুন্ডিচা মন্দির হলো বৃন্দাবন। জগন্নাথ ৯ দিন সেখানে থেকে রাধা ও গোপীদের বিরহ ভোলেন। তারপর “বাহুড়া যাত্রা”য় আবার দ্বারকায় ফেরেন। এই যাত্রাই হলো ভক্ত আর ভগবানের মিলন-বিরহের চিরন্তন খেলা।
পর্ব ৪: তিন রথের প্রতীক ও নির্মাণ রহস্য
প্রতি বছর নতুন করে তিনটি রথ তৈরি হয়। একটিও পেরেক ব্যবহার হয় না। শুধু দড়ি আর কাঠ।
৪.১ নন্দীঘোষ – জগন্নাথের রথ
- উচ্চতা: ৪ ফুট ২ ইঞ্চি
- চাকা: ১৬টি
- রং: লাল ও হলুদ
- ধ্বজা: ত্রৈলোক্যমোহিনী
- সারথি: দারুক
- রক্ষক: গরুড়
- ৯ জন পার্শ্বদেবতা
নাম “নন্দীঘোষ” মানে “আনন্দের ধ্বনি”। এই রথে ৪টি ঘোড়া থাকে – শঙ্খ, বলাহক, সুইত, হরিদাশ্ব।
৪.২ তালধ্বজ – বলভদ্রের রথ
- উচ্চতা: ৪৩ ফুট ৩ ইঞ্চি
- চাকা: ১৪টি
- রং: লাল ও সবুজ
- ধ্বজা: উন্নানী
- সারথি: মাতালি
- রক্ষক: বাসুদেব
শক্তি ও কৃষির প্রতীক। ঘোড়ার নাম তীব্র, ঘোর, দীর্ঘ, অনুপম।
৪.৩ দেবদলন – সুভদ্রার রথ
- উচ্চতা: ৪২ ফুট ৩ ইঞ্চি
- চাকা: ১২টি
- রং: লাল ও কালো
- ধ্বজা: নাদম্বিকা
- সারথি: অর্জুন
- রক্ষক: জয়দুর্গা
এটিই সবচেয়ে ছোট রথ, কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ঘোড়ার নাম রোচিকা, মোচিকা, জিতা, অপরাজিতা।
পর্ব ৫: রথযাত্রার ৯ দিনের অনুষ্ঠানক্রম
রথযাত্রা একদিনের নয়, এটি ৯ দিনের বিশাল যজ্ঞ।
১. অক্ষয় তৃতীয়া: রথ নির্মাণ শুরু
২. স্নান যাত্রা: জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় ১০৮ কলসি জলে স্নান। এরপর “অনসর” – ১৫ দিন জ্বর এসে বিগ্রহ অসুস্থ থাকেন।
৩. নেত্রোৎসব: সুস্থ হয়ে দর্শন দেওয়া
৪. গুন্ডিচা মার্জন: যাত্রার আগের দিন রাজা সোনার ঝাঁটা দিয়ে মন্দির ঝাঁট দেন – “ছেরা পাহারা”
৫. রথযাত্রা: আষাঢ় শুক্লা দ্বিতীয়া। ৩টি রথ টেনে গুন্ডিচা যাওয়া
৬. হেরা পঞ্চমী: লক্ষ্মীর অভিমান
৭. বাহুড়া যাত্রা: দশমীতে মূল মন্দিরে ফেরা
৮. সুনা বেশ: একাদশীতে সোনার গয়নায় সাজ
৯. নীলাদ্রি বিজে: দ্বাদশীতে মূল মন্দিরে প্রবেশ
পর্ব ৬: লোকবিশ্বাস ও সামাজিক তাৎপর্য
৬.১ জাতিভেদের অবসান
রথের দিনে পুরীতে কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই। ব্রাহ্মণ, শূদ্র, রাজা, ভিখারি – সবাই একসাথে রথের দড়ি ধরে। এর অর্থ – ঈশ্বর সবার। তিনি মানুষের কাছে আসেন, মানুষকে টানতে হয় না।
৬.২ আদিবাসী ও বৌদ্ধ যোগ
ওড়িশার আদিবাসী সবর সম্প্রদায়ের দেবতা “নীলমাধব”ই যে পরে জগন্নাথ হয়েছেন, তার প্রমাণ অনেক। আবার “জগন্নাথ” শব্দের অর্থ “বিশ্বের প্রভু” – যা বুদ্ধেরও একটি নাম। তাই অনেকে বলেন জগন্নাথ সংস্কৃতি হলো আর্য, অনার্য ও বৌদ্ধ ধার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
৬.৩ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি
রথযাত্রাকে ঘিরে পুরীর অর্থনীতি ঘোরে। মালি, তাঁতি, কাঠুরে, রাঁধুনি – সবার জীবিকা। ৫৬ ভোগ, মহাপ্রসাদ, পটচিত্র – সবই এই উৎসবকে কেন্দ্র করে।
পর্ব ৭: রথযাত্রার দার্শনিক ব্যাখ্যা
শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু পুরীতে এসে রথ টেনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন –
“রথ মানে শরীর। জগন্নাথ মানে আত্মা। আমরা যখন নিজের অহংকারের দড়ি দিয়ে ঈশ্বরকে নিজের হৃদয় রূপী রথে টানি, তখনই হয় আসল রথযাত্রা।”
আবার তান্ত্রিক মতে, তিন রথ হলো তিন গুণ – সত্ত্ব, রজ, তম। আর গুণ্ডিচা যাত্রা হলো জীবাত্মার পরমাত্মার দিকে যাত্রা।
উপসংহার: ‘নয়নপথগামী ভবতু মে’
রথযাত্রা শেষ হয় “নীলাদ্রি বিজে” দিয়ে। জগন্নাথ যখন আবার মূল মন্দিরে ঢোকেন, লক্ষ্মী দরজা বন্ধ করে দেন। অনেক কাকুতি-মিনতির পর তিনি ভেতরে ঢুকতে পারেন।
এই পুরো লীলার মধ্যে দিয়ে আমরা কী শিখি?
ঈশ্বর রাজা নন, তিনি বন্ধু। তিনি প্রাসাদে বসে থাকেন না, তিনি রাস্তায় নামেন। তিনি ভক্তের অভিমান বোঝেন, মাসির স্নেহ বোঝেন, আর সবচেয়ে বড় কথা – তিনি চান আমরা সবাই মিলে একটা দড়ি ধরি।
আজও যখন পুরীর বাতাসে ভাসে “নীলাচলে নীল শঙ্খ বাজে, জগন্নাথ স্বামী নয়নপথগামী, ভবতু মে”, তখন মনে হয় – রথ শুধু কাঠ আর দড়ির নয়। রথ হলো আমাদের মন। আর জগন্নাথ? তিনি সেই মনের পথে হেঁটে আসা এক চিরন্তন অতিথি।
জয় জগন্নাথ!
তথ্যসূত্র :– এ আই, উইকিপিডিয়া !