নিজস্ব প্রতিনিধি, পূর্ব বর্ধমান, জামালপুর, ৮ জুলাই ২০২৬: ছোটবেলায় রেডিয়োয় ভেসে আসা লোকগান শুনে স্বপ্ন দেখা। সেই স্বপ্নকে সঙ্গী করে কঠোর পরিশ্রম। আর আজ সেই ছেলেই আকাশবাণীর ‘যুববাণী’র নিয়মিত লোকসংগীত শিল্পী। পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম নন্দনপুরের ছেলে অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়– মাটির গানকে ভালোবেসে আজ নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
১. রেডিয়ো থেকে আকাশবাণী – স্বপ্নপূরণের যাত্রা
বাউল ও ফকিরি গান বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাণ। মানবতা ও প্রেমের বাণীই এই গানের মূল কথা। ছোটবেলা থেকেই এই মাটির গানের প্রতি টান ছিল অভিনন্দনের।
রেডিয়োয় আকাশবাণীর লোকসংগীতের অনুষ্ঠান শুনেই তার মনে ইচ্ছে জাগে – “একদিন আমিও আকাশবাণীতে গাইব”। সেই স্বপ্নই আজ সত্যি। বর্তমানে সে আকাশবাণীর ঐতিহ্যবাহী *‘যুববাণী’* বিভাগের একজন নিয়মিত লোকসংগীত শিল্পী।
২. বাবাই প্রথম গুরু, পড়াশোনাতেও সেরা
অভিনন্দনের প্রথম গুরু তার বাবা *বিজন বন্দ্যোপাধ্যায়*। পেশায় তিনি একজন পেশাদার সংগীত শিক্ষক এবং নিজেও সংগীতে স্নাতকোত্তর। একসময় তিনি প্রখ্যাত লোকশিল্পী সাধন বৈরাগ্যের আখড়ায় গিয়েও বাউল গানের তালিম নিয়েছেন।
স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাছে নিষ্ঠার সঙ্গে চলেছে লোকগানের কঠিন রেওয়াজ। পড়াশোনাকেও অবহেলা করেনি অভিনন্দন। এ বছর জামালপুরের অমরপুর বিমলা কৃষি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে সে স্কুলের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে।
স্কুলের টিচার ইন-চার্জ প্রিয়ব্রত মণ্ডল বলেন, _”অভিনন্দন আমাদের স্কুলের গর্ব। পড়াশুনার পাশাপাশি সংগীতেও সে নিজেকে পারদর্শী করে তুলেছে।”_
বর্তমানে সে হুগলীর শ্রীরামপুর কলেজে পদার্থবিদ্যায় অনার্স নিয়ে উচ্চশিক্ষা করছে।
৩. প্রকৃতি, পরিবার আর আদর্শ
দামোদর নদের অববাহিকায় সবুজে মোড়া নন্দনপুর গ্রামেই বাবা বিজনবাবু, মা টুম্পা দেবী এবং দিদি দেবারতীকে নিয়ে তার বাস।
অভিনন্দন বলে, _”লোকসংগীতের সঙ্গে সবুজে ঢাকা গ্রাম, গ্রামীণ মানুষ এবং প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের গ্রামের পরিবেশই আমাকে ছোটবেলায় লোকগানের অনুরাগী করে তোলে।”_
লোকসংগীতের জগতে সে লালন ফকির এবং সাধন বৈরাগ্যকে নিজের আদর্শ মানে। এই পথ চলায় মায়ের অনুপ্রেরণাও তার বড় শক্তি।
ছেলের সাফল্যে গর্বিত বাবা বিজনবাবুর কথায়, _”ছেলের মাটির প্রতি টান দেখেই আমি আমার সংগীত শিক্ষার সবকিছু উজাড় করে দিয়ে ওকে তৈরি করেছি। পড়াশোনা সামলে ও আজ আকাশবাণীর শিল্পী, বাবা হিসেবে এটা অত্যন্ত গর্বের।”_
৪. স্কুলের অনুপ্রেরণা
অভিনন্দনের এই কৃতিত্বকে কুর্নিশ জানাচ্ছে তার স্কুলও। টিচার ইন-চার্জ জানান, আকাশবাণীতে অভিনন্দনের গান সম্প্রচারিত হলেই তা স্কুলের লাউডস্পিকারে বাজিয়ে শোনানো হয়, যাতে বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা অনুপ্রাণিত হয়।
অভাব আর প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিকূলতাকে জয় করে, মাটির গন্ধ আর প্রকৃতির ছন্দকে বুকে বেঁধে জামালপুরের অভিনন্দন আজ বাংলার লোকসংগীতের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।