২২ জুন, muthokotha.in: একটি কয়েক মিনিটের ভাইরাল ভিডিও। তাতে দেখা গেল রাইডার ও যাত্রীর বচসা, যাত্রীর কিছু অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ। মুহূর্তের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়া দু’ভাগ হয়ে গেল। একদল রাইডারের পাশে দাঁড়িয়ে ‘যাত্রীর অত্যাচার’ বলে সরব হলেন , আর অন্য দল যাত্রীকে ‘প্রতারিত’ তকমা দিয়ে তাঁর হয়ে গলা ফাটালেন। কালবৈশাখিকে পেছনে ফেলে হ্যাশট্যাগ, মিম, গালাগালির ঝড় বয়ে গেল বাংলা ছাড়িয়ে ভিন্ রাজ্যের উপর দিয়ে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—কয়েক মিনিটের ক্লিপ কি দশ বছরের অভিজ্ঞতা, হাজারো বুকিং, লাখো কথোপকথনের বিকল্প হতে পারে? গত এক দশক ধরে হাওড়া, শিয়ালদহ ও কলকাতা স্টেশন চত্বরে নিয়মিত ওলা, উবার, র্যাপিডো বাইক ব্যবহার করা যাত্রী বিকাশবাবুর অভিজ্ঞতা বলছে, ‘ভাইরাল সত্য’ আর ‘রাস্তার সত্য’ এক কিন্তু নয়। তাঁর ডায়েরি ঘাঁটলেই বোঝা যায়, সমস্যাটা যতটা না অ্যাপের, তার চেয়ে বেশি ‘ব্যবহারের’ এবং ‘ব্যবস্থার’।
বুকিং বাতিলের চক্রব্যূহের প্রথম প্রশ্ন ‘কোথায় যাবেন?’
আর এই প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয়ে যায় হয়রানি। “অ্যাপে বুক করলেই নিশ্চিন্ত—এই ধারণাটাই এখন মিথ,” বলছেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতা, বুকিং অ্যাকসেপ্ট হওয়ার ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ফোন এসে যায়। প্রথম প্রশ্ন—“দাদা কোথায় যাবেন?” দ্বিতীয় প্রশ্ন—“ ভাড়া কত দেখাচ্ছে?” গন্তব্য সাঁতরাগাছি, বেলঘরিয়া, বেহালা শুনলেই অর্ধেক রাইডার ‘নেটওয়ার্ক নেই’ বলে কেটে দেন। ভাড়া ৭০-৮০ টাকা দেখালে সোজা উত্তর—“পোষাবে না দাদা, ক্যানসেল করুন।”
৮ মে ২০২৬, হাওড়া স্টেশন, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত—তিন ঘণ্টায় ৮ বার বুকিং বাতিল হলো বিকাশবাবুর। প্রতিবারই একই স্ক্রিপ্ট। কেউ বললেন, “ওদিকে গেলে খালি ফিরতে হবে”, কেউ বললেন, “১০০ টাকার কমে স্টার্ট করি না।” দু’একজনের ভাষা এতটাই অশালীন যে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অপমানে কান লাল হয়ে যায়। শেষে তিন ঘণ্টা নষ্ট করে প্রিপেড ট্যাক্সিতে তিনগুণ ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হলো।
রেলযাত্রীদের অভিযোগ, স্টেশন চত্বরে এই ‘সিন্ডিকেট’ এখন ওপেন সিক্রেট। অ্যাপ অন রেখে খদ্দের বাছাই, পছন্দ না হলে বাতিল, পছন্দ হলে অ্যাপের বাইরে দরদাম—এটাই ‘নিউ নর্মাল’। তারমানে গন্তব্যে পৌঁছে ‘নতুন রেট’: অ্যাপের ভাড়া শুধুই দেখানোর জন্য?
১৪ জুন ২০২৬, কলকাতা স্টেশনের ঘটনা তিনি তুলে ধরেছেন, অ্যাপে হাওড়া পর্যন্ত ভাড়া ১০৮ টাকা। প্রথম ৪ জন রাইডার ‘হবে না’ বলে কেটে পড়লেন। পঞ্চমজন রাজি হলেন। কিন্তু হাওড়া ব্রিজ পেরিয়েই শুরু হল আসল খেলা। “দাদা, ১০০ টাকায় পোষায়? ৩৫০ দিন।” প্রতিবাদ করলে উত্তর, “অ্যাপ তো কোম্পানির, পেট্রোল তো আমার পকেটের।” আধ ঘণ্টা বাগবিতণ্ডার পর ৩০০ টাকায় রফা হলো তাঁর সঙ্গে।
বিকাশবাবুর আরও প্রশ্ন, “অ্যাপের রেট যদি না-ই মানব, তাহলে অ্যাপে থাকা কেন? খদ্দের ধরার জন্য অ্যাপ, আর টাকা নেওয়ার সময় নিজের রেট—এটা কি প্রতারণা নয়?” পরিবহন দপ্তরের এক আধিকারিক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, “অভিযোগ পাই রোজ। কিন্তু যাত্রী তাড়াহুড়োয় থাকেন, লিখিত দেন না। ফলে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।” তিনি নিজেই মানছেন, দোষ একতরফা নয়।
তিনি আরও বলেন “আমি নিজে দেখেছি, অনেকে ৩-৪টা অ্যাপে একসঙ্গে বুক করেন। যে আগে আসে তার সঙ্গে যান, বাকিগুলো ক্যানসেল। রাইডার ২ কিমি এসে দেখেন ক্যানসেলড। তেল পুড়ল, সময় গেল, ইনসেন্টিভও গেল।” এছাড়া গন্তব্যে পৌঁছে ‘খুচরো নেই’ বলে ১০-২০ টাকা কম দেওয়া, মাঝরাস্তায় লোকেশন পাল্টে দেওয়া, মদ্যপ অবস্থায় দুর্ব্যবহার—এমন যাত্রীও কিন্তু কম নন। “রাইডারের ক্ষোভ তাই অমূলক নয়। কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশ যদি গালাগাল বা বাড়তি ভাড়া আদায় হয়, সেটাও সমর্থনযোগ্য নয়।”
‘ভালো-খারাপ’ ভাগ করলে সমাধান মিলবে না। তিনি বলেন “আমি ১০ বছরে অন্তত ২,০০০ বার বাইক বুক করেছি। ৭০% রাইডার ভদ্র, পেশাদার, সময়নিষ্ঠ। ঝড়-জলে কাকভোরে এসে হাসিমুখে স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছেন। ৩০%-এর জন্যই বাকি ৭০% বদনাম হচ্ছে,”!সমস্যা হল, ভাইরাল ভিডিওতে ওই ৩০%-এর একটা খণ্ডচিত্রই ‘পুরো সত্য’ হয়ে যায়। যাত্রীর তিন ঘণ্টার হয়রানি, অপমান, অতিরিক্ত টাকা গোনা—এসবের ভিডিও হয় না। ফলে ‘জনমত’ তৈরি হয় একপেশে তথ্যে।
এবার আসি সমাধানের কথায়,ক. অ্যাপ সংস্থার দায়:
১. গন্তব্য দেখে বুকিং বাতিল করলে রাইডারের রেটিং ও ইনসেন্টিভে প্রভাব ফেলতে হবে।
২. ‘অ্যাপ রেট ফাইনাল’—এই নীতি কঠোরভাবে লাগু করা ও বাড়তি ভাড়া চাইলে অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড।
৩. যাত্রীর একাধিক বুকিং ধরা পড়লে জরিমানা বা সাময়িক ব্লক।
প্রশাসনের কী ভূমিকা নেওয়া উচিত ?
১. স্টেশন চত্বরে পরিবহন দপ্তরের হেল্পডেস্ক, যেখানে তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানানো যাবে।
২. ভাড়া নৈরাজ্য রুখতে নিয়মিত সারপ্রাইজ চেকিং ও কড়া জরিমানা।
আমাদের দায় ?
১. ভাইরাল ভিডিও দেখে ‘ফাঁসি চাই’ বলার আগে দু’পক্ষের কথা ভাবা।
২. রাইডার ও যাত্রী—দু’জনেই পরিষেবা ও সম্মান ডিজার্ভ করেন, এটা মনে রাখা।
পরিশেষে একথা বলবো, অ্যাপ-বাইক শহরের লাইফলাইন। রাইডার ছাড়া যাত্রী অচল, যাত্রী ছাড়া রাইডারের সংসার অচল। একটি মিনিট খানেকের ভিডিও দিয়ে এই সম্পর্কের বিচার হয় না। বাস্তবতা হল, ক্যামেরার সামনে যা ঘটে, তার দশগুণ ঘটে ক্যামেরার পিছনে। সেখানে যাত্রীর চোখের জলও থাকে, রাইডারের শূন্য পকেটও থাকে। তাই রায় দেওয়ার আগে ভিডিও নয়, শুনুন অভিজ্ঞতা। কারণ সমস্যাটা রাইডার বনাম যাত্রী নয়—সমস্যাটা সিস্টেমের ফাঁক আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব।
একটি ভাইরাল ক্লিপ গোটা ছবি নয়। পুরো ছবিটা দেখতে হলে রাস্তায় নামতে হবে, কথা বলতে হবে, শুনতে হবে। তবেই সুবিচার সম্ভব। শুধু ভিডিও দেখে, মেয়েটির কয়েকটি অশ্লীল শব্দ শুনে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।