ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন একের পর এক মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে, তখন ইতিহাস মনে করিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে ঘটা সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের কথা। লিপিবদ্ধ ইতিহাসে আজও সবচেয়ে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হিসেবে রেকর্ড হয়ে আছে ১৫৫৬ সালের ২৩ জানুয়ারি চিনের শানসি প্রদেশের ভূমিকম্প। এক রাতেই প্রায় ৯ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সেই মহাপ্রলয়ে।
চিনে তখন মিং রাজবংশের আমল চলছিল। ১৫৫৬ সালের ২৩ জানুয়ারি, ভোরবেলা। শানসির হুয়াক্সিয়ান এলাকায় আঘাত হানে ভয়াবহ ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল প্রায় ৮.০। কিন্তু ধ্বংসের আসল কারণ ছিল স্থানীয় বাসস্থান-রীতি।
উত্তর চিনের বেশিরভাগ মানুষ তখন ‘ইয়াওডং’-এ বাস করতেন — লোয়েস মাটির খাড়া পাহাড় কেটে তৈরি কৃত্রিম গুহা-ঘর। ভূমিকম্পের প্রবল ঝাঁকুনিতে সেই গুহাগুলো মুহূর্তে ধসে পড়ে। ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন্ত কবর হয়ে যান।
চিনা হিসেব অনুযায়ী, সরাসরি ভূমিকম্পে মারা যান প্রায় ১ লক্ষ মানুষ। কিন্তু পরবর্তী ভূমিধস, মহামারি, দুর্ভিক্ষ ও ঠান্ডায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮ লক্ষ ৩০ হাজার। কোনও কোনও অনুমান বলছে সংখ্যাটা ৯ লক্ষের কাছাকাছি।
ভূপ্রকৃতিও বদলে যায় । কম্পনের তীব্রতায় পাহাড় সরে যায়, নদীর গতিপথ বদলে যায়, রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। জমি ফেটে নতুন পাহাড় ও উপত্যকার সৃষ্টি হয়। ভূমিধসে গ্রামের পর গ্রাম কয়েক মিনিটে মাটির তলায় চলে যায়। হুয়াক্সিয়ান, ওয়েইনান ও হুয়াইন অঞ্চল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৬০% জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় কিছু এলাকায়।
কেন এত ক্ষয় ক্ষতি হলো?
১. ইয়াওডং গুহাঘর: নরম লোয়েস মাটিতে খোদাই করা ঘর ভূমিকম্পে সবচেয়ে দুর্বল। ছাদ ধসে লক্ষ লক্ষ মানুষ চাপা পড়েন।
২. শীতের ভোর: ঘটনাটি ঘটে জানুয়ারির কনকনে শীতের ভোরে। বেশিরভাগ মানুষ তখন ঘুমিয়ে। পালানোর সুযোগ পাননি।
৩. আফটারশক ও দুর্ভিক্ষ: মূল কম্পনের পর মাসের পর মাস ধরে চলা আফটারশকে আরও ঘরবাড়ি ভাঙে। চাষের জমি নষ্ট হওয়ায় দুর্ভিক্ষ ও রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
শানসির এই ভূমিকম্প আজও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাঠ্যবইয়ে ‘কেস স্টাডি’। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু কম্পনের মাত্রা নয়, বাড়ি তৈরির কৌশল, জনঘনত্ব ও সময় — এই তিনটি বিষয়ই ঠিক করে দেয় মৃত্যুর সংখ্যা।
ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি আবারও মনে করাল, প্রকৃতির কাছে মানুষ কতটা অসহায়। আর শানসির ৪৬৮ বছর পুরনো সেই ভোর প্রমাণ করে, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাতক হয়ে উঠতে পারে কয়েক সেকেন্ডের কাঁপুনি।