রাজ্যে সংগঠিত অপরাধ ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ রুখতে ‘পশ্চিমবঙ্গ গুণ্ডা দমন বিল, ২০২৬’ পাস হল বিধানসভায়। সোমবার তুমুল বিতর্ক ও বিরোধীদের ওয়াকআউটের মধ্যেই ধ্বনিভোটে বিলটি পাস করিয়ে নেয় রাজ্য সরকার। রাজ্যপালের স্বাক্ষরের পর এটি আইনে পরিণত হবে।
বিলের মূল ধারা: কী আছে নতুন আইনে:—
১. গুণ্ডার সংজ্ঞা:—আইনে ‘গুণ্ডা’ বলতে বোঝানো হয়েছে— খুন, ধর্ষণ, তোলাবাজি, জমি দখল, বেআইনি অস্ত্র রাখা, সিন্ডিকেট, মাদক ও নারী পাচার, সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানো-সহ ২১টি অপরাধে বারবার অভিযুক্ত ব্যক্তিকে। এক বছরে দুটি চার্জশিট হলেই তাকে ‘গুণ্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে।
২. প্রতিরোধমূলক আটক:– জেলাশাসক বা পুলিশ কমিশনার আশঙ্কা করলে কোনও ব্যক্তিকে ৬ মাস পর্যন্ত বিনা বিচারে আটক রাখতে পারবেন। রাজ্যের উপদেষ্টা বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে মেয়াদ আরও ৬ মাস বাড়ানো যাবে।
৩. সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত:—- তদন্তে অপরাধ থেকে অর্জিত সম্পত্তি প্রমাণ হলে জেলাশাসক তা বাজেয়াপ্ত করতে পারবেন। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে সেই সম্পত্তি সরকারের খাস হবে।
৪. কঠোর শাস্তি:— গুণ্ডা হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বনিম্ন ৩ বছর, সর্বোচ্চ ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। গুণ্ডাকে আশ্রয় দিলে ২ বছর পর্যন্ত জেল।
৫. বিশেষ আদালত:— মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি জেলায় ‘গুণ্ডা দমন বিশেষ আদালত’ গঠন করা হবে। ৬ মাসের মধ্যে বিচার শেষ করার লক্ষ্য।
৬. পুলিশের ক্ষমতা— সন্দেহভাজন গুণ্ডার ফোন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, সোশ্যাল মিডিয়ায় নজরদারির ক্ষমতা পাবে পুলিশ। ওয়ারেন্ট ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেফতারের অধিকার থাকছে।
সরকারের যুক্তি, ‘সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার’ :–
বিল পেশ করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “তোলাবাজি, সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে গজিয়ে ওঠা দুষ্কৃতীদের জন্য সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। পুলিশের হাত বাঁধা থাকায় ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছিল না। এই আইন পুলিশকে আইনি হাতিয়ার দেবে। কোনও নিরীহ মানুষ হয়রান হবেন না, কারণ উপদেষ্টা বোর্ডে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি থাকবেন।”
তিনি আরও জানান, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, মহারাষ্ট্রে একই ধরনের আইন রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও কঠোর আইনের পক্ষে মত দিয়েছে।
বিরোধীদের আপত্তি, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হবে’:—-
বিলের বিরোধিতা করে বিজেপি ও কংগ্রেসের বিধায়করা বিধানসভা থেকে ওয়াকআউট করেন। বিরোধী দলনেতার অভিযোগ, “গুণ্ডার সংজ্ঞা এতটাই অস্পষ্ট যে সরকার চাইলেই বিরোধী নেতা-কর্মীদের গুণ্ডা তকমা দিয়ে জেলে পুরতে পারবে। বিনা বিচারে আটক ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ধারা সংবিধানের মূল অধিকারের পরিপন্থী।”
তিনি দাবি করেন, আইনে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা’ বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট রক্ষাকবচ নেই। বিলটি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়।
আইনজীবীদের মত:—
আইনজীবী মহলের একাংশ বলছে, প্রতিরোধমূলক আটক ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ধারা NSA ও PMLA-র মতো কেন্দ্রীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে অপব্যবহার রুখতে হাইকোর্টের নজরদারি জরুরি। অপর অংশের মতে, ‘বারবার অভিযুক্ত’ কথাটির ব্যাখ্যা অস্পষ্ট। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর আশঙ্কা থাকছে।
পরবর্তী ধাপ:—
বিধানসভায় পাস হওয়ার পর বিলটি রাজ্যপালের কাছে পাঠানো হবে। রাজ্যপাল স্বাক্ষর করলেই গেজেট নোটিফিকেশন জারি করে আইন কার্যকর করবে রাজ্য। স্বরাষ্ট্র দফতর সূত্রে খবর, ৩০ দিনের মধ্যে রুলস তৈরি করে জেলায় জেলায় নির্দেশিকা পাঠানো হবে।
একনজরে বিল:—
নাম: পশ্চিমবঙ্গ গুণ্ডা দমন বিল, ২০২৬
উদ্দেশ্য: সংগঠিত অপরাধ দমন
সর্বোচ্চ শাস্তি: ১০ বছর জেল + ৫ লক্ষ জরিমানা
বিশেষ ক্ষমতা: বিনা বিচারে ১ বছর আটক, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
নজরদারি: উপদেষ্টা বোর্ডে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি
এই আইন কার্যকর হলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার ছবিটা বদলাবে, নাকি নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হবে— তার উত্তর দেবে সময়।