মাত্র ২৪ বছর বয়সেই শেষ হয়ে গেল স্বপ্ন। জম্মুতে কর্তব্যরত অবস্থায় অস্বাভাবিক মৃত্যু হল জলপাইগুড়ির মেয়ে, বিএসএফ জওয়ান বিশ্বপ্রিয়া রায়ের। সোমবার রাতে জম্মু থেকে বিশেষ বিমানে তাঁর কফিনবন্দি দেহ এসে পৌঁছয় বাগডোগরা বিমানবন্দরে। সেখান থেকে সড়কপথে দেহ পৌঁছয় জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি ব্লকের বাড়িতে। মেয়ের নিথর দেহ দেখে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েন মা। শোকে স্তব্ধ গোটা এলাকা।
ময়নাগুড়ি ব্লকের সাপ্টিবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা বিশ্বপ্রিয়া রায়। ছোট থেকেই মেধাবী, খেলাধুলোয় তুখোড়। স্কুল পাশের পর দেশসেবার স্বপ্ন নিয়ে বিএসএফ-এ যোগ দেন। ২০২৩ সালে ট্রেনিং শেষ করে পোস্টিং হয় জম্মু সেক্টরে। পরিবারের বড় মেয়ে বিশ্বপ্রিয়া। বাবা দিনমজুর, মা গৃহবধূ। ছোট ভাই স্কুলপড়ুয়া। বেতনের টাকায় সংসারের হাল ধরেছিলেন তিনিই।
বিএসএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত রবিবার জম্মুর পালৌরা ক্যাম্পে নিজের ব্যারাকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয় বিশ্বপ্রিয়াকে। সঙ্গে সঙ্গে মিলিটারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে মনে করা হলেও, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও কোর্ট অফ ইনকোয়ারির পরেই মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।
সোমবার জম্মুতে বিএসএফ-এর পক্ষ থেকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গান স্যালুট দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর বিমানে দেহ পাঠানো হয় বাংলায়।
মঙ্গলবার সকালে বিএসএফ-এর কনভয় যখন কফিন নিয়ে সাপ্টিবাড়ির বাড়িতে ঢোকে, তখন কান্নার রোল ওঠে। মা শেফালি রায় মেয়ের কফিন জড়িয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। বলছিলেন, “মা রে, তুই না বলেছিলি পুজোয় বাড়ি আসবি? এইভাবে ফিরলি? তোকে ছাড়া আমি কী নিয়ে বাঁচব?”
প্রতিবেশী অনিতা বর্মন জানান, “খুব হাসিখুশি মেয়ে ছিল। ছুটিতে বাড়ি এলে পাড়ার বাচ্চাদের নিয়ে কুচকাওয়াজ করাত। বলত, দেশের জন্য কাজ করব। সেই মেয়েটা এভাবে চলে গেল, মানতে পারছি না।”
মঙ্গলবার দুপুরে জলপাইগুড়ির জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, বিএসএফ-এর উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা বিশ্বপ্রিয়ার বাড়িতে যান। শেষ শ্রদ্ধা জানান। জেলাশাসক শামা পারভিন বলেন, “বিশ্বপ্রিয়ার মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি। জেলা প্রশাসন পরিবারের পাশে আছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সবরকম সাহায্য করা হবে।”
বিকেলে ময়নাগুড়ি মহাশ্মশানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। বিএসএফ জওয়ানরা গার্ড অফ অনার দেন। শূন্যে গুলি ছুড়ে, বিউগলের করুণ সুরে বিদায় জানানো হয় ভারতমাতার বীর কন্যাকে।
মাত্র ২৪ বছরের এক জওয়ানের কেন অস্বাভাবিক মৃত্যু হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন গ্রামবাসীরা। কর্মক্ষেত্রে কোনও মানসিক চাপ ছিল কি না, র্যাগিং বা হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন কি না, সব দিক খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছে পরিবার। বিএসএফ-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোর্ট অফ ইনকোয়ারি শুরু হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত হবে।
দেশের সীমান্ত পাহারা দিতে গিয়ে জলপাইগুড়ির এই কন্যা আর ফিরলেন না। রয়ে গেল তাঁর ইউনিফর্ম পরা হাসিমুখের ছবি, আর মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ।
বিশ্বপ্রিয়া রায়ের অকাল প্রয়াণে ‘ময়নাগুড়ি টাইমস’-সহ গোটা জলপাইগুড়িবাসী শোকাহত।