“গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরুদেব মহেশ্বর”—এই মন্ত্রে দীক্ষিত ভারতীয় সমাজে শিক্ষককে পিতামাতার পরেই স্থান দেওয়া হত। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক হেনস্তা, সোশ্যাল মিডিয়ায় কটূক্তি কিংবা সামান্য শাসনেই পুলিশি মামলার ঘটনা বাড়ছে। ছাত্রছাত্রীদের একাংশের মধ্যে শিক্ষকের প্রতি আগের সেই ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা আর দেখা যায় না। প্রশ্ন উঠছে—কেন এই অবক্ষয়? এর দায় কি শুধু ছাত্রের, না কি সমাজ-পরিবার-শিক্ষাব্যবস্থারও?
১. প্রত্যক্ষ কারণ
ক. শাস্তির অধিকার কেড়ে নেওয়া: ২০০৯-এর শিক্ষার অধিকার আইনে শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উদ্দেশ্য মহৎ হলেও, বিকল্প ‘ইতিবাচক শাসন’-এর প্রশিক্ষণ শিক্ষকরা পাননি। ফলে শ্রেণিশৃঙ্খলা রক্ষার ন্যূনতম ক্ষমতাও হারিয়েছেন অনেকে। ছাত্র বুঝে গেছে, ‘স্যার কিছু করতে পারবেন না’।
খ. মূল্যায়ন ব্যবস্থার বদল: পাশ-ফেল তুলে দেওয়া, অবাধ প্রমোশন, নম্বরের জন্য প্রাইভেট টিউশন নির্ভরতা—সব মিলিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ‘নম্বরদাতা’ নন, তাই তাঁর গুরুত্বও কমছে ছাত্রের কাছে।
গ. ডিজিটাল বিকল্পের দৌরাত্ম্য: ইউটিউব, এডটেক অ্যাপ, চ্যাটজিপিটি—জ্ঞানের উৎস এখন হাতের মুঠোয়। ছাত্রের মনে ধারণা জন্মাচ্ছে, ‘স্যার না বোঝালেও চলবে’। শিক্ষক হয়ে উঠছেন কেবল সিলেবাস শেষ করার যন্ত্র।
ঘ. শিক্ষকের মান ও আচরণ: কিছু শিক্ষকের প্রাইভেট টিউশনে বাধ্য করা, প্রশ্ন ফাঁস, রাজনৈতিক পক্ষপাত, শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ঘাঁটা—এসব ঘটনাও ছাত্রের মনে শ্রদ্ধা নষ্ট করে। ‘যাঁকে সম্মান করব, তাঁর আচরণ তেমন কোথায়?’—এই প্রশ্ন ওঠে।
২. পরোক্ষ কারণ
ক. পরিবারের ভূমিকা বদল: আগে বাবা-মা বলতেন, ‘স্যার মেরেছেন মানে তুই দোষ করেছিস’। এখন অনেক অভিভাবক সন্তানের সামনেই শিক্ষককে ফোনে ধমক দেন, স্কুলে গিয়ে হুমকি দেন। সন্তান শিখছে, শিক্ষক ‘চাকরিজীবী’, ‘গুরু’ নন।
খ. ভোগবাদী সমাজের প্রভাব: টাকা, ক্ষমতা, গ্ল্যামার—এগুলোই এখন ‘সফলতা’র মাপকাঠি। শিক্ষকতা কম বেতনের, কম ‘পাওয়ার’ এর পেশা। ছাত্র দেখছে, সমাজ যাঁকে দাম দেয় না, তাঁকে আমি কেন দেব?
গ. গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া: শিক্ষকের সামান্য ভুল ভাইরাল হয়, লক্ষ লক্ষ শেয়ার হয়। অথচ হাজার ভালো কাজ চাপা পড়ে যায়। ছাত্রের অবচেতনে গেঁথে যায় ‘মাস্টার মানেই খারাপ’ ন্যারেটিভ।
ঘ. অধিকার বনাম কর্তব্যের ভারসাম্যহীনতা: ছাত্রকে তার অধিকার শেখানো হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষকের প্রতি কর্তব্য শেখানো হচ্ছে না। ‘চাইল্ড রাইটস’ এর নামে অনেক সময় ঔদ্ধত্যকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।
৩. উত্তরণের পথ: কী করলে ফিরবে শ্রদ্ধা
ক. শিক্ষকের ক্ষমতায়ন ও প্রশিক্ষণ: শাস্তি নয়, ‘শ্রেণি-পরিচালনা’ ও ‘কাউন্সেলিং’ এর বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শৃঙ্খলা ভাঙলে নির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও মর্যাদাহানিকর নয় এমন ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি রক্ষাকবচ চাই।
খ. শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধি: বেতন কাঠামো, পদোন্নতি, সামাজিক স্বীকৃতি—এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। যে দেশে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার দিবস ঘটা করে পালন হয়, সেখানে শিক্ষক দিবস কেবল ‘ড্রামা’ আর ‘গিফট’ এ আটকে থাকলে চলবে না। ভালো শিক্ষককে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত ও প্রচার করতে হবে।
গ. পরিবারকে যুক্ত করা: অভিভাবক-শিক্ষক বৈঠককে নিয়মরক্ষার না করে ‘পার্টনারশিপ’ মডেলে আনতে হবে। সন্তানের সামনে শিক্ষকের সমালোচনা নয়, সমস্যা হলে সরাসরি স্কুলে কথা বলার সংস্কৃতি গড়তে হবে।
ঘ. পাঠ্যক্রমে মূল্যবোধ ফেরানো: ‘গুরুশিষ্য পরম্পরা’, ঈশ্বরচন্দ্র-ছাত্র সম্পর্ক, এপিজে আবদুল কালামের ছাত্রদরদ—এই গল্পগুলো শুধু পড়া নয়, চর্চা করতে হবে। একইসঙ্গে ছাত্রকেও শেখাতে হবে, সমালোচনা আর অপমানের তফাৎ।
ঙ. শিক্ষককেও আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে: ছাত্রকে সম্মান দিলে তবেই সম্মান ফেরত পাওয়া যায়। একপেশে বক্তৃতা না দিয়ে আলোচনা, প্রশ্নকে স্বাগত জানানো, প্রযুক্তিকে আপন করে নেওয়া, নিজের বিষয়ে আপডেট থাকা—এগুলো শিক্ষককে আবার ‘অপরিহার্য’ করে তুলবে।
সবশেষে যে কথা না বললেই নয়—- শ্রদ্ধা আদায়ের বিষয়, দাবির বিষয় নয়। শুধু আইন করে বা নস্টালজিয়ায় ভুগে শ্রদ্ধা ফেরানো যাবে না। পরিবার শেখাবে বিনয়, সমাজ দেবে শিক্ষককে প্রাপ্য মর্যাদা, রাষ্ট্র দেবে ক্ষমতা ও প্রশিক্ষণ, আর শিক্ষক নিজে হবেন জ্ঞান, চরিত্র ও সহমর্মিতার বাতিঘর—এই চারটি শর্ত পূরণ হলেই শ্রেণিকক্ষে আবার ফিরবে সেই চেনা ছবি: ছাত্র উঠে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘গুড মর্নিং স্যার’। চোখে ভয় নয়, থাকবে সম্ভ্রম।