ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রকে শাসন করার অভিযোগে পুলিশি মামলার জেরে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হল বছর পঞ্চাশের এক শিক্ষককে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে মাথাভাঙ্গা মহকুমা আদালতের এজলাসই হয়ে উঠল সেই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংহতির মঞ্চ। শ্রদ্ধেয় বিচারকের পর্যবেক্ষণ, আইনজীবীদের সমর্থন আর ছাত্রছাত্রীদের ভালবাসায় অভিযুক্ত শিক্ষক তন্ময় চক্রবর্তী ফিরলেন ফুলের মালা গলায় নিয়ে।
ঘটনাটি নতুন করে উস্কে দিল বহু পুরনো সেই বিতর্ক—শিক্ষকের শাসন আর শাস্তির সীমারেখা ঠিক কোথায়? কোচবিহারের মাথাভাঙ্গা হাইস্কুলের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক তন্ময় চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে সম্প্রতি এক ছাত্রের মা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।
অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষে ছাত্রকে ‘শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা’ করেছেন ওই শিক্ষক। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে। ১৯ জুন ( ২০২৬ ) ধৃত শিক্ষককে মাথাভাঙ্গা মহকুমা আদালতে হাজির করা হয়।
এ.সি.জে.এম শিভম মিশ্র মামলার নথিপত্র দেখে রীতিমতো অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এজলাসে দাঁড়িয়েই তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন, —– “শিক্ষকেরা শাসন করেন বলেই আমরা আজ বিচারক, আইনজীবী, ডাক্তার হতে পেরেছি। শাসন ছাড়া শিক্ষা হয় না। অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে, শিক্ষক কখনোই ছাত্রের শত্রু নন।” বিচারক স্পষ্ট জানান, অভিযোগপত্রে যে ধরনের ‘হেনস্তা’র কথা বলা হয়েছে, তার প্রাথমিক প্রমাণ মেলেনি। এরপর তিনি শিক্ষক তন্ময় চক্রবর্তীকে পি.আর বন্ডে মুক্তি দেন।
একইসঙ্গে তদন্তকারী অফিসারকে তলব করে নির্দেশ দেন—কোন যুক্তিতে, কী তথ্যের ভিত্তিতে একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা রুজু করা হল, তার লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।
চমকপ্রদভাবে আদালতের সরকারি আইনজীবী থেকে শুরু করে বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা প্রায় সকলেই শিক্ষকের পাশে দাঁড়ান। বর্ষীয়ান আইনজীবী অমল রায় বলেন, “আইনের অপব্যবহার করে শিক্ষকদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে। আজ যদি শিক্ষক ছাত্রকে বকতেও না পারেন, তবে কাল স্কুলে শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে না।”
সরকারি আইনজীবীও সওয়ালে জানান, অভিযোগের কোনো সারবত্তা নেই।সকাল থেকেই আদালত চত্বরে ভিড় জমিয়েছিল মাথাভাঙ্গা হাইস্কুলের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা। হাতে প্ল্যাকার্ড, পোস্টার—‘আমরা স্যারের পাশে আছি’, ‘শাসন ছাড়া শিক্ষা অসম্পূর্ণ’।
মুক্তির আদেশের পরই এজলাস থেকে বেরোনো মাত্র শিক্ষককে ফুলের মালা, চকলেট দিয়ে সংবর্ধনা জানায় তারা। অনেকের চোখেই তখন জল। দ্বাদশ শ্রেণির এক ছাত্রী বললেন,— “স্যার অন্যায় করলে বকেন, আবার মন খারাপ হলে নিজে পাশে বসে বোঝান। উনি আমাদের গার্জেন।”আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত তন্ময় চক্রবর্তী বলেন, — “আজকের ঘটনা আমাকে নতুন করে শেখাল, ছাত্রছাত্রীর ভালবাসাই শিক্ষকের আসল প্রাপ্তি। আইনের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা ছিল। ছাত্রকে মানুষ করাই আমার ব্রত। এই সমর্থন আগামী দিনে আমাকে আরও নিষ্ঠা দিয়ে পড়াতে সাহস জোগাবে।” তিনি তাঁর বক্তব্যে আরও যোগ করেন,–” শাসন মানে আঘাত নয়, শাসন মানে পথ দেখানো”!
ঘটনার পর মাথাভাঙ্গা জুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। শিক্ষক সংগঠনগুলি একযোগে জানিয়েছে, সামান্য কারণে শিক্ষকদের হেনস্তা বন্ধ করতে প্রশাসনকে নীতিমালা তৈরি করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির কোচবিহার জেলা সভাপতি বলেন, “আমরা ছাত্রদরদি। কিন্তু শিক্ষককে আসামি বানিয়ে দিলে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।”
অন্যদিকে অভিভাবকদের একাংশের মত, শাসনের নামে শারীরিক নির্যাতন মেনে নেওয়া যায় না। তবে কোথায় শাসন শেষ আর নির্যাতন শুরু, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দরকার। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ থাকে যে, ২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইনে স্কুলে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ। কিন্তু ‘শাসন’ আর ‘শাস্তি’র ফারাক নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। মনোবিদরা বলছেন, ভয় দেখিয়ে নয়, ভালবেসে শোধরানোই আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি। আবার প্রবীণ শিক্ষকদের মতে, একেবারে ‘শাসনহীন’ শ্রেণিকক্ষে পঠনপাঠন অসম্ভব।
মাথাভাঙ্গার এই ঘটনা সেই বিতর্ককেই নতুন করে সামনে আনল। কাঠগড়ায় দাঁড় করানো শিক্ষক ফিরলেন ছাত্রের ফুল আর আদালতের সম্মান নিয়ে। কিন্তু রয়ে গেল প্রশ্ন—আগামী দিনে শিক্ষক-ছাত্র-অভিভাবক সম্পর্কের রসায়ন কোন পথে বইবে? শাসনের অধিকার আর সন্তানের সুরক্ষার দাবি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন সমাজের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সমাধান চাই, শাসনের শেষ কোথায়? নির্যাতনের রূপ কেমন? বকুনির ধরণ কেমন হলে তা মানসিক নির্যাতনের রূপ লাভ করে? বকুনির মধ্যে কী ভালবাসার মন্ত্রণা থাকতে পারে না?