প্রথমেই প্রশ্ন করা যাক্ পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির কি কোনো অবদানই নেই? আসুন এবার এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিই।
ইতিহাস বলছে , ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভায় যে সাংবিধানিক ভোটে পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তি নিশ্চিত হয়, সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যক্ষ ভূমিকা কি ‘বিপক্ষে’ ছিল ? এই বিষয়টি কিন্তু খুবই স্পর্শকাতর। তবে গোটা দেশভাগ পর্ব এবং পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা কোনোভাবেই সরলরৈখিক ছিল না। বিষয়টিকে বুঝতে হলে চারটি পর্যায়ে ভেঙে দেখার দরকার আছে।
১. দেশভাগের আগে CPI ( কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া ) -এর নীতিগত অবস্থান:
‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ সমর্থন১৯৪২-৪৬ পর্বে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের ‘লাহোর প্রস্তাব’ বা পাকিস্তান দাবিকে সমর্থন করেছিল। তখন CPI-এর যুক্তি ছিল— ভারত একটি ‘বহুজাতিক রাষ্ট্র’, মুসলিমরা একটি পৃথক জাতি, তাই তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ করবার অধিকার আছে। এটি ‘অধিকার কমিশন’ রিপোর্ট হিসেবে পরিচিত। CPI-নেতা ও প্রখ্যাত রসায়ন বিজ্ঞানী ড. গঙ্গাধর অধিকারী এটি লিপিবদ্ধ করেন ( এটি Resolution on Pakistan and National Unit নামে পরিচিত )। ফলে ১৯৪৬-এর নির্বাচনে CPI মুসলিম লীগের সঙ্গে বোঝাপড়া করে লড়ে। বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারকে তারা বাইরে থেকে সমর্থনও করে।
২. এপ্রিল-জুন ১৯৪৭:
‘সার্বভৌম যুক্তবঙ্গ’র পক্ষে অবস্থান১৯৪৭-এর এপ্রিলে শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায়, সুরাবর্দী ও আবুল হাশিম ‘সার্বভৌম অবিভক্ত বাংলা’র প্রস্তাব আনেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, বাংলা ভাগ হলে কলকাতা বন্দর, শিল্প ও পাট-অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া এই প্রস্তাবকে পূর্ণ সমর্থন করে।
ক) মাঠের কর্মসূচি:
অন্যদিকে সরাসরি মাঠে নেমে জননেতা জ্যোতি বসু, আব্দুল্লাহ রসুল, ভবানী সেন, মুজফ্ফর আহমদ কলকাতা, ঢাকা, চট্টগ্রামে ‘বাংলা ভাগ রুখো’ স্লোগান দিয়ে মিছিল করেন। সংগঠিত শ্রমিক ইউনিয়নগুলিতে এই ‘ সার্বভৌম অবিভক্ত বাংলা’ প্রস্তাব পাশও করানো হয়। CPI-এর তৎকালীন মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় বড়ো বড়ো করে লেখা হয়, ‘বাংলা ভাগ সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত’।
খ) বিরোধিতা:
কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জোরালোভাবে তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে নেতৃত্বদের বোঝাবার চেষ্টা করেন যে, মুসলিম লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে যুক্তবঙ্গ কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। গান্ধীজি প্রথমে ‘যুক্তবঙ্গ’ নিয়ে আগ্রহ দেখালেও পরের দিকে তিনিও সরে আসেন। জাতীয় কংগ্রেসের উচ্চ নেতৃত্ব জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেলও রাজি হননি। এর ফলে মাউন্টব্যাটেন ৩ জুন তাঁর বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনায় বাংলা ভাগের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত করতে সফল হলেন।
৩. ২০ জুন ১৯৪৭, বঙ্গীয় আইনসভায় ভোট ও কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া-র অবস্থান:-
৩ জুনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভায় দুই দফায় ভোট হয়। পশ্চিমবঙ্গ এলাকার ৭৮ জন সদস্যের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন ৩ জন—জ্যোতি বসু, রতনলাল ব্রাহ্মণ এবং রূপনারায়ণ রায়। ‘পশ্চিমবঙ্গ ভারতে যোগ দেবে’ — এই প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি শুরু হয়। ভোটাভুটির পর দেখা গেল, ‘পশ্চিমবঙ্গ ভারতে যোগ দেবে’—এই প্রস্তাবে ৫৮-২১ ভোটে প্রস্তাব পাশ হয়। মুসলিম লিগের ২০ জন এবং ইউরোপীয় সদস্য ১ জন, মোট ২১ টি ভোট এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পড়ে। অর্থাৎ এখানে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন।
তাহলে এখানে কমিউনিস্ট পার্টির ৩ সদস্যের ভোট কী হলো — এই প্রসঙ্গে জ্যোতি বসু পরে তাঁর আত্মজীবনী ‘যতদূর মনে পড়ে’-গ্রন্থে লিখেছেন—” আমরা চেয়েছিলাম অবিভক্ত বাংলা। বাংলা ভাগ মানে বাঙালির শক্তি ভাগ। তাই আমরা ভারত বা পাকিস্তান—কোনো ভাগের পক্ষেই ভোট দিইনি।” তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন –তখন কমিউনিস্ট পার্টির মূল বিরোধিতা ছিল ‘সাম্প্রদায়িক ভাগ’, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন।
তারমানে বিষয়টি পরিষ্কার যে, ২০শে জুন ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে কমিউনিস্ট বিধায়ক জ্যোতি বসু ও রতনলাল ব্রাহ্মণ ভোট দিয়েছিলেন কী দেননি তা জ্যোতি বসু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কিন্তু স্বাধীনতার পরে ১৯৫৬ সালে রাজ্য ভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারকে জুড়ে দেওয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছিল কংগ্রেস। কমিউনিস্ট পার্টির জোরদার আন্দোলন ও ঘোর বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ‘ পশ্চিমবঙ্গ – বিহার সংযুক্তি ‘-র প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এই ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না।
৪. দেশভাগের পর, ভারতের ভিতরে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা:-
১৫ আগস্ট ১৯৪৭-এর পর CPI ভারতের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়। ১৯৪৮-৫০ সালে তেলেঙ্গানা সশস্ত্র সংগ্রাম ও ‘কলকাতা থিসিস’ পর্বে নিষিদ্ধ হলেও, ১৯৫২-র প্রথম সাধারণ নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে আসে।
পরবর্তী অবদান:
১. উদ্বাস্তু আন্দোলন: ৫০-এর দশকে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর পুনর্বাসন, কলোনি-দখল আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়।
২. খাদ্য আন্দোলন ১৯৫৯, ট্রাম ভাড়া আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গণআন্দোলন গড়ে তোলে।
৩. ভূমিসংস্কার: ১৯৭৭-২০১১ বামফ্রন্ট আমলে ‘অপারেশন বর্গা’র মাধ্যমে ৩০ লক্ষ ভাগচাষীকে জমির অধিকার দেওয়া হয়।
৪. পঞ্চায়েত ব্যবস্থা: ত্রিস্তর পঞ্চায়েত চালু করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে।
৫. ভাষা ও সংস্কৃতি: বাংলা ভাষা, শিক্ষা বিস্তার ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি রক্ষায় বড় ভূমিকা গ্রহণ করে।
দুটি পর্ব আলাদা:
এক ) ১৯৪৭-এর জুন:
আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তি নিশ্চিত করার ভোটে CPI-এর অবদান শূন্য, বরং তারা বিপক্ষে ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল অবিভক্ত বাংলা, যা সফল হলে আজকের পশ্চিমবঙ্গের জন্মই হত না — এই মতামত সম্পূর্ণ সঠিক নয়।
দুই ) ১৯৪৭-পরবর্তী:
ভারতভুক্ত পশ্চিমবঙ্গকে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও জনমুখী রাজ্য হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের ভূমিকা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসন তারই প্রমাণ।
উপসংহার:
ইতিহাসের বিচারে কোনো দলকেই ‘সাদা’ বা ‘কালো’ দাগে ভাগ করা যায় না। ১৯৪৭-এর জুনে কমিউনিস্টরা পশ্চিমবঙ্গ গঠন কান্ডে নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিল —– এটা তথ্য।
আবার ১৯৫৬ সালে পশ্চিমবঙ্গকে বিহারের সঙ্গে যুক্ত হতে না দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবদান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ—– এটা তথ্য।
তার পরের ৭৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক-সামাজিক নির্মাণে তাঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য —- এটাও তথ্য।
এই তিনটি তথ্যকে একসঙ্গে স্বীকার করলে তবেই ইতিহাসের পাতায় কমিউনিস্টদের পূর্ণাঙ্গ ছবি উঠে আসে।