শব্দের শহর এগরায় মহাকুমা বইমেলার ১৭তম সাধারণ সভা ও কৃতি সম্বর্ধনায় সংস্কৃতির জয়গান
শব্দের শহর, বইয়ের শহর। সেই শহরের বুকে আরও একবার উচ্চারিত হলো জ্ঞানের মন্ত্র। রবিবারের স্নিগ্ধ সকালে এগরা সারদা শশীভূষণ কলেজের নাট্য ও নাট্যচর্চা বিভাগের সভাঘরে মহাসমারোহে সম্পন্ন হলো এগরা মহকুমা বইমেলার ১৭তম বার্ষিক সাধারণ সভা ও কৃতি সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান।
সকাল থেকেই সভাঘরে ছিল উৎসবের আমেজ। বইপ্রেমী, শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, জনপ্রতিনিধি ও ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল প্রেক্ষাগৃহ। অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে। মেলা কমিটির কার্যকরী সভাপতি তথা এগরা প্রেসক্লাবের সভাপতি বীর কুমার শী পতাকা উত্তোলন করে স্বাগত ভাষণ দেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল আবেগ, ছিল আগামী দিনের স্বপ্ন। এরপর প্রয়াত সদস্যদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এক মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। তাঁদের সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয় মেলা কমিটির পক্ষ থেকে। এই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধুর ও শ্রদ্ধাপূর্ণ।
এদিনের অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করেন মেলা কমিটির স্থায়ী সভাপতি তথা মহকুমা শাসক কর্মবীর কেশব। তাঁর সুদক্ষ পরিচালনায় সভা এক অনন্য মাত্রা পায়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন কবিতা প্রধান, মঞ্জু মহাপাত্র, মীনাক্ষী রানা কামিলা ও অমৃতা নাজির। তাঁদের সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হয় দেশপ্রেমের সুর। এরপর মেলার থিমসঙ্গ পরিবেশন করেন বিশিষ্ট কবি ও সুরকার হেমন্ত মাইতি। তাঁর সুরে ও কথায় যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে বইমেলার দীর্ঘ পথচলা।
শুভ্র বৈদিক মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আধ্যাত্মিক সূচনা করেন আজীবন সদস্য শংকরনারায়ণ মিশ্র। তাঁর উদাত্ত মন্ত্রোচ্চারণে সভাঘরে এক পবিত্র পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এরপর মঙ্গলদীপ প্রজ্জ্বালন ও কৃতি সংবর্ধনা পর্বের উদ্বোধন করেন মেলার মুখ্য পৃষ্ঠপোষক তথা এগরা বিধানসভা এলাকার জনপ্রিয় বিধায়ক দিব্যেন্দু অধিকারী। মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান করে নেওয়া ৫ জন কৃতি শিক্ষার্থীর হাতে পুষ্পস্তবক, মানপত্র ও স্বামী বিবেকানন্দের অমূল্য গ্রন্থ তুলে দিয়ে তিনি তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য আশীর্বাদ করেন। এই সম্বর্ধনা শুধু পুরস্কার নয়, আগামী প্রজন্মকে বইমুখী করার এক মহৎ প্রয়াস।
এরপর মেলার বিগত বছরের আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব তুলে ধরেন কোষাধ্যক্ষ আশিস দাস। তাঁর স্বচ্ছ ও নির্মোহ উপস্থাপনা সকলের প্রশংসা কুড়ায়। এরপর মঞ্চে আসেন এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল কারিগর তথা এগরা প্রেসক্লাব ও এগরা বইমেলা কমিটির সম্পাদক বিশিষ্ট সাংবাদিক গৌরীশংকর মহাপাত্র। তিনি বিগত সভার গৃহীত সিদ্ধান্ত ও সম্পাদকীয় প্রতিবেদন পাঠ করেন এবং উপস্থিত সকলকে গঠনমূলক পর্যালোচনায় অংশ নিতে আহ্বান জানান। তাঁর প্রতিবেদনে উঠে আসে ১৩তম বইমেলা থেকে ১৪তম বইমেলার দিকে এগিয়ে যাওয়ার রূপরেখা, সংগ্রাম ও সাফল্যের কাহিনি। তিনি জানান, বইমেলা শুধু বই বিক্রির স্থান নয়, এটি একটি আন্দোলন, একটি সংস্কৃতি।
তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে একে একে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্টজনেরা। এগরা-১ পঞ্চায়েত সমিতির পক্ষে তাপস দে, জুমকী গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সত্যেন দাস, সাহাড়া পঞ্চায়েতের প্রধান পুষ্পলতা সাউ মাইতি, জেলা পরিষদ সদস্য প্রদীপ বর, দুব্দা পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান দিলীপ বর, বলাগেড়িয়া ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ও আজীবন সদস্য পার্থসারথী দাস, শিক্ষিকা মহুয়া মাইতি ও ঈপ্সিতা মাইতি, স্বাস্থ্যকর্মী মিঠু সিং, ললাট হাই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক নবকান্ত জানা, আইনজীবী অঙ্কুসোনা ঘাটা, শিক্ষক অলকেশ মাইতি প্রমুখ তাঁদের মূল্যবান পরামর্শ দেন। সকলেই মেলাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও জনমুখী করার জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব রাখেন।
এদিনের সভায় নব নির্বাচিত বিধায়ক দিব্যেন্দু অধিকারীকে এবং নতুন এগরা মহকুমার মহকুমা শাসককে উত্তরীয়, ব্যাচ, মানপত্র ও পুস্তক দিয়ে সংবর্ধিত করা হয়। স্বামীজির বাণী সম্বলিত সেই মানপত্র পাঠ করেন সহ-সম্পাদক অধ্যাপক ড. মৃণাল কান্তি দাস ও মানস কুমার মাইতি, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক নবকান্ত জানা ও আইনজীবি অমল রঞ্জন রায়। তাঁদের কণ্ঠে স্বামীজির বাণী যেন নতুন করে প্রেরণা জোগায় সকলকে।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নেগুয়া হাই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক ড. শিবশংকর মহাপাত্র, জাহালদা ও এগরা হাই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক ড. কালীপদ প্রধান, এগরা-২ পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন সভাপতি প্রকাশ রায় চৌধুরী, প্রাক্তন ব্যাঙ্ক আধিকারিক সুকুমার রায়, এগরা সারদা শশীভূষণ কলেজের নাট্য বিভাগের প্রধান, বিশিষ্ট নাট্যকর্মী ও নির্দেশক অধ্যাপক মলয় বারিক, প্রাক্তন অধ্যাপক স্বপন মিশ্র সহ বহু গুণীজন।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গত বছরের সিদ্ধান্তগুলি ঐক্যমতে অনুমোদিত হয়। আগামী ১৪তম বইমেলাকে আরও বর্ণময়, আরও তথ্যসমৃদ্ধ করে তোলার জন্য রূপরেখা তৈরি হয়। আপ্যায়নের সৌজন্যে ছিলেন বালিঘাই জগন্নাথ জীউ সেবা সমিতির পক্ষে সহ সম্পাদক বিরজাকান্ত প্রধান ও শিশির মাইতি। সাংবাদিক সংগঠনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন গৌতম পাত্র, মদন মাইতি, রাজকুমার মহাপাত্র, সুমন কল্যাণ প্রধান প্রমুখ।
অবশেষে সভা সুসম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান মেলা কমিটির অন্যতম সহ-সম্পাদক তপন কুমার মন্ডল। তাঁর ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়েই শেষ হয় এক ঐতিহাসিক সন্ধ্যা, যা এগরার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আরও একটি স্বর্ণালী পালক যোগ করল।