পটাশপুরে গেরুয়া পতাকার প্রথম প্রহরী, আজ ব্রাত্য ? আশিস দাসের ৪০ বছরের নিষ্ঠা, ত্যাগ ও হতাশার কাহিনি
পটাশপুর, পূর্ব মেদিনীপুর: যে সময় অবিভক্ত মেদিনীপুরে ‘বিজেপি’ নামটা মুখে আনতেও মানুষ দু’বার ভাবত, যে সময় লাল পতাকার দাপটে গেরুয়া পতাকা হাতে রাস্তায় বেরোনো মানে মার খাওয়া অবধারিত, ঠিক সেই সময় পটাশপুরের বুকে একা দাঁড়িয়ে যে মানুষটা গেরুয়া পতাকাটা তুলে ধরেছিলেন, তাঁর নাম আশিস দাস। পটাশপুরের মতিরামপুর গ্রামে এক বনেদি পরিবারে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পিতা নলিনীকান্ত দাসকে এলাকার মানুষ ভীষণ সমীহ করতেন। কলেজে পড়া কালীন ছাত্র পরিষদের সদস্য হন। ছাত্র রাজনীতি থেকেই কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ আসে। কিন্তু কংগ্রেসের রাজনীতি বেশিদিন তার পছন্দ হয়নি।
১৯৮৪ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গ ছেড়ে এক বছরের রাজনৈতিক নির্বাসন। কিন্তু রাজনীতি যাঁর রক্তে, তিনি কি আর দূরে থাকতে পারেন? সেই নেশাই তাঁকে ১৯৮৬ সালে টেনে নিয়ে গেল ভারতীয় জনতা পার্টির দিকে। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলা বিজেপির সভাপতি ডাঃ মনোরঞ্জন দত্তের হাত ধরে সেদিন বিজেপির সদস্য পদ নিয়েছিলেন আশিস দাস। সঙ্গে ছিলেন নিত্যানন্দ বল্লভ, রোহিনী জানা। আশিস দাসই হলেন পটাশপুর থানা বিজেপির প্রথম কনভেনার। তখন গোটা পটাশপুরে বিজেপি বলতে হাতে গোনা ৫-৭ জন।
শূন্য থেকে শুরু, নিজের পকেটের টাকায় দল গড়া:
তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৮৮ সালে মেদিনীপুর লোকসভায় সিপিআইয়ের কিংবদন্তি নেতা ইন্দ্রজিৎ গুপ্তের বিরুদ্ধে প্রার্থী হন মনোরঞ্জন দত্ত। পটাশপুর বিধানসভার পুরো সাংগঠনিক দায়িত্ব কাঁধে নেন আশিস দাস। ১৯৯১ সালে সিপিআইয়ের হেভিওয়েট কামাখ্যা নন্দন দাস মহাপাত্রের বিরুদ্ধে তিনি প্রার্থী করেন নিত্যানন্দ বল্লভকে। লড়াইটা অসম ছিল, কিন্তু তিনি পিছপা হননি। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে, সাইকেলে চেপে গ্রামে গ্রামে ঘুরে দলের পরিচয় পৌঁছে দিয়েছেন।
সেই কঠিন দিনে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে একে একে বিজেপিতে এসেছিলেন শ্যাম সাউ, নন্দদুলাল দাস, আড়গোয়ালের মাধব মাইতি, বাল্য গোবিন্দপুরের শীর্ষেন্দু দাস যিনি এগরা হাইস্কুলের গণিতের শিক্ষক ছিলেন, পালপাড়ার তপন ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন সানা, সুকুমার সানা, ফনিভূষণ বাগ, পঁচেটের পীতাম্বর গিরি, সুখেন্দু পণ্ডা, খাড়ের ভবেশ অধিকারী, ছাড়াদিঘির বিজয় মান্না, অজয় মান্না, চাঁদপুরের রাধাকান্ত জানা, সাদতপুরের সুনীল হুদাইত, খাড়ের ভবতোষ আচার্য্যের মতো অসংখ্য নিষ্ঠাবান কর্মী। এরা কেউ পদ চাননি, শুধু আদর্শকে ভালোবেসে এসেছিলেন।
আন্দোলন, মামলা, সংসার:
আন্দোলন থেকে নির্বাচন, সবেতেই প্রথম সারিতে আশিস দাস। ১৯৯৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনে নিজের স্ত্রী ঝর্ণা দাসকে প্রার্থী করেন। ওই নির্বাচনে পটাশপুর ১ নম্বর ব্লকে ৩টি ও ২ নম্বর ব্লকে ৫টি আসনে বিজেপি জয়লাভ করে, যা ছিল অবিশ্বাস্য। ১৯৯৪ সালে পটাশপুর থানার সামনের রাস্তা নিয়ে ঐতিহাসিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তিনি। পুলিশ মামলা করে তাঁর বিরুদ্ধে। সেই মামলা আজ ৩০ বছর পরও চলছে।
১৯৯৮ সালে নবগঠিত তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে পটাশপুর ১ ব্লকের গোনাড়া অঞ্চলে সবিতা ঘোড়াই উপপ্রধান হন। পটাশপুরের ইটাচনা থেকে নির্বাচিত হন শিক্ষক অমলেন্দু দাস (১৯৯৮/২০০৩) । ২০০৩ সালে আলোকলতা মহান্তি মৎস্য কর্মাধ্যক্ষ ও তরুলতা বেরা পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যা নির্বাচিত হন।
২০০১ সালে কৌশলগতভাবে কামাক্ষা নন্দনের বিরুদ্ধে তাঁরই খুড়তুতো ভাই মনীন্দ্র নন্দন দাস মহাপাত্রকে প্রার্থী করেন। ২০০৪ সালে রাহুল সিনহা যখন মেদিনীপুর লোকসভার প্রার্থী, তখন আশিস দাস জেলা সম্পাদক, জেলা সভাপতি মহিষাদলের শীতল মণ্ডল। শমীক ভট্টাচার্য, রাহুল সিনহা, রীতেশ তিওয়ারি, রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো রাজ্য নেতারা বারবার তাঁর বাড়িতে এসে বৈঠক করেছেন, চা খেয়েছেন।
১৯৯৬ সালে অনিল গোস্বামী এবং ২০১১ সালে তিনি নিজে পটাশপুর বিধানসভায় তৃণমূলের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় কর ও সিপিআইয়ের মাখনলাল নায়কের বিরুদ্ধে লড়েন। তখন তিনি পূর্ব মেদিনীপুরের সহ-সভাপতি। হারলেও তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই, পটাশপুরে বিজেপিকে প্রাসঙ্গিক করা।
হাতে টানা রিক্সায় শ্যামাপ্রসাদের জয়ন্তী:
সবচেয়ে আবেগের অধ্যায় হলো সিপিএমের মধ্যগগনে, যখন বিজেপি করলে বাড়িতে হামলা হতো, তখন নিজের ছোট ছোট দুই মেয়েকে নিয়ে হাতে টানা রিক্সায় চেপে পাড়ায় পাড়ায় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী পালন করতেন। বড় মেয়ে মৌমিতা আজও কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “সেই সময় বাবার সঙ্গে রিক্সায় আমাদের দেখে লোকে হাসতো, টিটকিরি করতো, ঢিল ছুড়তো।”
আজকের হতাশা, ব্রাত্য নিষ্ঠা:
২০২১-এর পটাশপুর বিধানসভা নির্বাচনে তিনি আশা করেছিলেন দল তাঁকে টিকিট দেবে। ৪০ বছরের নিষ্ঠার স্বীকৃতি মিলবে। কিন্তু দল টিকিট দেয়নি। তারপরও তিনি নীরবে দলের কাজ করেছেন, একটিও কটু কথা বলেননি।
কিন্তু আজ দলের সুদিনে, বিজেপি যখন রাজ্যে শাসক দল, কেন্দ্রে ক্ষমতায়, তখন আশিস বাবুর মতো মানুষরা চাইছেন সামান্য সম্মান। কিন্তু হচ্ছে উল্টোটা।
তাঁর বুকফাটা আর্তনাদ, “দীর্ঘ ৩০-৪০ বছর ধরে বুথে বুথে যাঁরা নির্লোভভাবে বিজেপিকে ভালোবেসে, নীতি-আদর্শকে ভালোবেসে দলটা করে এসেছেন এই পটাশপুর থানা এলাকায়, তাঁরা আজ দলের কাছে একপ্রকার ব্রাত্য। একদিন যারা সিপিএম, তৃণমূলে থেকে আমাকে মেরেছিল, আজ তাঁদের নেতৃত্বেই আমাকে কাজ করতে হচ্ছে। আজ যাঁরা পটাশপুরে বিজেপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই একদিন আমাকে শারীরিকভাবে আঘাত পর্যন্ত করেছিলেন।” এরপরও তাঁর দলের প্রতি ভালবাসা এবং নিষ্ঠায় কোনোও খামতি পড়ে নি, দল যেখানে যখন যেতে বলেন তিনি ছুটে যান। তিনি আরও বলেন দুঃখ কষ্ট করলে হবে না, এখন বয়স হয়েছে আমাদের মতো বর্ষীয়ান নেতাদের এবার বিশ্রাম নেওয়ার সময় এসেছে। হতাশার অতল আঁধার পেরিয়ে আশিসবাবুদের মতো নেতারা দলকে আলোর সন্ধান দিতে চান কিন্তু নেওয়ার লোকের খুব অভাব।
এটা শুধু আশিস দাসের গল্প নয়। এটা পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার পুরোনো বিজেপি কর্মীর নীরব যন্ত্রণার দলিল। যাঁরা নিজের পকেট ফাঁকা করে, মার খেয়ে, মামলা খেয়ে, পরিবারের সময় কেড়ে দলটাকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন, আজ ক্ষমতার অলিন্দে নতুন, সদ্য আসা মুখের ভিড়ে তাঁরা হারিয়ে যাচ্ছেন।
পটাশপুরের ইতিহাসে বিজেপি শব্দটা উচ্চারণের সাহস যিনি প্রথম দেখিয়েছিলেন, আজ তিনিই সবচেয়ে হতাশ, চিন্তিত। তাঁর চিন্তা নিজের জন্য নয়, দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে। নিষ্ঠার কি কোনো দাম নেই? এই প্রশ্ন আজ শুধু আশিস দাসের নয়, গোটা পুরোনো প্রজন্মের।